দোদুল্যমান কিয়েভের ভবিষ্যৎ

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৫, ০৭:৪০ এএম

কয়েক দিন ধরেই ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপের উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে। মূলত কিয়েভকে পাশ কাটিয়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরুর পর থেকেই ইউরোপের নেতার কপালের ভাঁজ বাড়তে থাকে। ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে যুদ্ধ অবসানে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সঙ্গে শুক্রবার ওয়াশিংটনে পৌঁছান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এ সফরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুল আলোচিত খনিজ সম্পদ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার সুসম্পর্ক নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। স্টারমার-ট্রাম্পের বৈঠক শেষে ইউক্রেন যুদ্ধের সবশেষ অবস্থার বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো।

স্টারমার-ট্রাম্প বৈঠক

ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ওভাল অফিসের বৈঠকের শুরুতে রাজা তৃতীয় চার্লসের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাজ্য সফর করতে ট্রাম্পের হাতে একটি রাজকীয় আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন স্টারমার। দুই দেশের শীর্ষ নেতার এ বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ। যেখানে দ্রুতই এ যুদ্ধ অবসানের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। আর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জোর দিয়েছেন ইউক্রেনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ওপর। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে এমনটাই জানিয়েছেন ঐতিহাসিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের এ দুই নেতা। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। এ নিয়ে সমঝোতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, শান্তিচুক্তিটি শিগগিরই হতে পারে আবার আদৌ না হতে পারে। তবে ইউরোপ ও কিয়েভের মূল যে চাওয়া সেই নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি ট্রাম্প। তিনি বলেন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বিষয়েই খোলাখুলি অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু সবার আগে রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে চুক্তি চান তিনি। ফলে ইউরোপের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা হিসেবে ইউক্রেন ইস্যুতে অনেকটাই শূন্য হাতে ওয়াশিংটন থেকে ফিরছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।

জেলেনস্কিকে বিরল প্রশংসা

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের আগে সুর পাল্টেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে তাদের আসন্ন বৈঠকের আগে জেলেনস্কির প্রতি যথেষ্ট সম্মান রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প, যা বেশ চমকের সৃষ্টি করেছে। জেলেনস্কিকে বিভিন্ন সময় কৌতুক অভিনেতা, সেরা বিক্রয়কর্মী স্বৈরশাসকসহ নানা বিশেষণে কটাক্ষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে বৃহস্পতিবার জেলেনস্কিকে খুবই সাহসী আখ্যা দিয়ে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে স্বৈরাচার অভিহিত করার বিষয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন করে  ট্রাম্প বলেন, আমি আসলেই এটা বলেছিলাম? আমার মনে হয় না, আমি এটা বলেছি। জেলেনস্কির এ সফরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের এই খনিজ সম্পদ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। তিন বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে নিজেদের সহায়তার বিপরীতে ইউক্রেনের বিপুল খনিজ সম্পদের দাবি করেছেন ট্রাম্প। ইউক্রেনের বিপুল পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও খনিজ, যেমন লিথিয়াম ও টাইটানিয়ামের পাশাপাশি প্রচুর কয়লা, গ্যাস, তেল ও ইউরেনিয়ামের মজুদ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার কূটনৈতিক দলের বৈঠক

দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার শীর্ষ কূটনীতিকরা। দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে চলমান নানা উত্তেজনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভয়ানক অবনতি হয়। তবে সাবেক বাইডেন প্রশাসনের অধীনে রুশ-মার্কিন সম্পর্কের পারদ তলানিতে এসে ঠেকে। তবে নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনের নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। তাতে দুই দেশই নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী হয়েছে। রুশ রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা তাস জানিয়েছে, ইস্তাম্বুলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল কার্যালয়ে রুদ্ধদ্বার এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ছয় ঘণ্টা আলোচনা শেষে বৈঠক বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে কোনো বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। তবে বৈঠকে দূতাবাস সম্পর্কিত বিরোধ নিরসন ও কূটনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিকীকরণের লক্ষ্যে আলোচনা হয়েছে। সেই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা করেছে দুই দেশের কূটনীতিকরা। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের সভায় মূলত দূতাবাসে কর্মী নিয়োগ, ভিসা প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক ব্যাংকিং নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিগত এক দশকে পারস্পরিক দ্বন্দ্বের জেরে দুই দেশই একে অন্যের একাধিক কূটনীতিবিদকে বহিষ্কার করে দিয়েছে। এতে দুই দেশের দূতাবাসেই তৈরি হয়েছে কর্মী সংকট।

পরস্পরে আস্থা ট্রাম্প-পুতিনের

রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রাথমিক ধাপের পর তিনি ভালো কিছুর আশা করছেন। বৃহস্পতিবার রুশ গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি কর্মীদের প্রতি দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রাথমিক সংলাপ নতুন আশা জাগাচ্ছে। দুপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার কাঠামোয় গড়ে ওঠা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর সমাধানের লক্ষ্যে ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। এর আগে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকে পুতিনের প্রতি আস্থার কথা শুনিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ইউক্রেনে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি এবং পুতিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু মানুষ আছে যাদের সবাই প্রতারক ভাবে অথচ তারাই শতভাগ সৎ। আমি পুতিনকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করি, তিনি প্রতিশ্রুতি রাখবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত