কিশোরগঞ্জ শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা নরসুন্ধা বর্ষায় রূপ নিত খরস্রোতা নদীতে। আর অন্য সময় হয়ে উঠত টলমল জলের আঁধার। কুলিয়ারচরের কালী নদীতে এক সময় বড় বড় মালবাহী নৌকা চলাচল করত। নদীর পাড়ে বসত রমরমা হাটবাজার। কিন্তু দখল-দূষণে মৃতপ্রায় ওই নদী দুটোতে এখন কোনো স্রোত নেই। জঞ্জাল আর কচুরিপানায় ঢেকে আছে তাদের বুক। কোথাও কোথাও রূপ নিয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। জেলায় ৪৩টি নদ-নদীর মধ্যে প্রায় ৩০টির অবস্থাই নরসুন্ধা কিংবা কালীর মতো। পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, জেলার শত শত ‘দখলদার’ এসব নদ-নদীর ‘গলা টিপে’ ধরেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে ‘প্রভাবশালী’ হওয়ায় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ। এভাবে চলতে থাকলে আক্ষরিক অর্থে ‘মারা যাবে’ নদ-নদীগুলো।
কিশোরগঞ্জ সদরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরে নদ-নদীগুলোর বেহাল চিত্র দেখা গেছে। শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নরসুন্ধা নদীর পাড়ের বেশিরভাগই চলে গেছে দখলদারদের হাতে। এই নদীটির করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ও কাদির জঙ্গল ইউনিয়নের মধ্যবর্তী দেওয়ানগঞ্জ বাজার সেতর পশ্চিমে মূল গতিপথের দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে প্রাচীর তুলে বাগানবাড়ি করেছেন দেশি ইজমা শোভা জর্দা কোম্পানির মালিক ও জেলার কয়েকজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত মঞ্জু মিয়া। তার দখলের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে মানববন্ধনও করেছেন। তারপরও প্রশাসন ছিল নির্বাক। মঞ্জু মিয়ার ভাষ্য, তিনি তার কেনা জায়গা ভবন নির্মাণ করেছেন। অবশ্য সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মঞ্জু মিয়ার মতো মোট ৪১ জন নরসুন্দা নদীর পাড়ের প্রায় ৮২ শতাংশ জায়গা দখল করেছেন।
এদিকে কটিয়াদী উপজেলার করগাঁও গ্রাম দিয়ে বয়ে যাওয়া অডা শিমুহা নদী করগাঁও মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড ইজারা নিয়েছে জলমহাল হিসেবে। সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম সমিতি পরিচালনা করেন। সম্প্রতি তিনি নদীটিতে বাঁধ দিয়ে সেচে মাছ শিকার করেছেন। এ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে অনেক চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কেউই ভয়ে মুখ খুলছেন না। বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত আবদুস সালামের সঙ্গে কথা হলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে। মাটি কাটতেছে। আমি কিন্তু নদী সেচার পক্ষে না। আমি শুধু জাল দিয়ে মাছ ধরি।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, নদ-নদী অবৈধ দখলে প্রভাবশালীরা জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। নদীর অবৈধ দখল এবং এর স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করা ঠেকানোর আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ নেই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কিশোরগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, নদী ‘জীবন্ত সত্তা’ মহামান্য হাইকোর্টের এই ঘোষণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নদ-নদীগুলো হত্যা করছে, দখল-দূষণ করা হচ্ছে। বিভিন্নভাবে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করে, নদীশাসনের নামে নদ-নদীগুলোর প্রাণ-প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
নদীবিষয়ক পত্রিকা রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কাছে জেলার নদ-নদীর অবৈধ দখলদারের তালিকা রয়েছে। কিন্তু সে মোতাবেক দখলদার ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কিশোরগঞ্জের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য ড্রেজিংয়ের (খনন) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং স্থাপনা যেগুলো নদীভাঙনের শিকার হয়েছে বা হচ্ছে, সেগুলোতে কীভাবে আমরা প্রতিরক্ষার কাজ বাস্তবায়ন করব, তারও সমীক্ষা হচ্ছে। এই সমীক্ষার ফল পাওয়ার পর এগুলো নিয়ে প্রকল্প প্রণয়ন করব।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান বলেন, নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যারা দখল করছে, তাদের উচ্ছেদ করা হবে। নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
