ইলিয়াস মোল্লাহর দখলে ৭০০ একর সরকারি জমি

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৫, ০৭:২২ এএম

রাজধানীর মিরপুর, রূপনগর ও পল্লবীসহ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকটি ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-১৬ আসন। সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ তার আসনের কোনো সরকারি জমি ফাঁকা থাকলেই দখল করতেন। তিনি মিরপুরে হাজার কোটি টাকা মূল্যের ৭০০ একর সরকারি জমি দখল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই জমি দখল করে তৈরি করেছেন বস্তি, অস্থায়ী মার্কেট ও দোকান।

এসব বস্তি, মার্কেট ও দোকানে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ওয়াসার পানিরও সংযোগ দিয়ে প্রতি মাসের ভাড়া বা চাঁদা তুলেছেন। এ ছাড়া মিরপুরের বিল-ঝিলের অঘোষিত মালিক ছিলেন তিনি। এসব জমি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তার রয়েছে ৫০ জনের সন্ত্রাসী বাহিনী। ইলিয়াস মোল্লাহ তার পরিবারের দখলে থাকা সরকারি জমিসহ অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন বলে অভিযোগ জমা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। কমিশন অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংস্থাটির উপপরিচালক মোজাম্মিল হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে।

জানা গেছে, অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ৫ ফেব্রুয়ারি অভিযোগসংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র চেয়ে ব্যাংক, বীমা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস, বিদ্যুৎ অফিস, তিতাস গ্যাস, ঢাকা ওয়াসাসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিসে চিঠি দিয়েছে অনুসন্ধান টিম।

টিমের প্রধান উপপরিচালক মোজাম্মিল হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ ও অন্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, গণপূর্ত কাজে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মিরপুরের ৭০০ একর সরকারি জমি দখলসহ নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অনুসন্ধান চলছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে সাবেক এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, তার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন ও চার সন্তানের নামে-বেনামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য দুদকে পাঠাতে বলা হয়েছে। দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, ইলিয়াস মোল্লাহর আয়ের বড় একটি উৎস হলো দুয়ারীপাড়া। ১৯৮১ সালে মিরপুর সাড়ে ১১-সংলগ্ন দুয়ারীপাড়ার ৪৭৩টি প্লট জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ সরকারি কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ দেয়। এসব প্লটের আয়তন পৌনে দুই, আড়াই ও তিন কাঠা। ওই জমি ওয়াকফ এস্টেটের বলে দাবি করলে জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ওই জমি ইলিয়াস মোল্লাহ দখলে নেন। ১৯৯৬ সাল থেকে ধীরে ধীরে এসব জমি নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। জমি থেকে উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বছরে মোটা অঙ্কের চাঁদা নেওয়া হতো। এ ছাড়া সেখানে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে প্রতি মাসে বিল বাবদ এবং ভাড়ার নামে টাকা তুলতেন তিনি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ওয়াকফ এস্টেটের নামে ওই জায়গায় ৪৭৩টি প্লট ছিল। এসব প্লটে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ছিল সাত হাজারের বেশি। যত প্লট বাড়ানো হবে তত টাকা এ ধারণায় ৪৭৩টি প্লটকে ভেঙে সাত শতাধিক প্লট বানানো হয়। প্লটগুলো যাদের দখলে ছিল তারা ইলিয়াস মোল্লাহর কাছে জিম্মি ছিল।

এসব প্লট থেকে চারবার উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে প্রতিবারই প্লট প্রতি দুই থেকে চার লাখ করে মোট অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইলিয়াস মোল্লাহ। এ ছাড়া এলাকার মার্কেট, ছোট দোকান, ফুটপাতের দোকান থেকেও তার অনুগতরা নিয়মিত টাকা তুলত। সে টাকা সরকারি তহবিলে জমা দেওয়া হতো না।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০০৮ সালে দুয়ারীপাড়ায় সরকারি প্লট থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়। পরের বছর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ইলিয়াস মোল্লাহর বাহিনী তা পুনরায় দখল করে নেয়। দখল পাকাপোক্ত করতে তারা একই বিষয়ে পাঁচ-ছয়বার মামলা করে। কিন্তু প্রতিবারই আদালত সরকারের পক্ষে রায় দেয়।

এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের ঢাকা বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘বেদখল হয়ে যাওয়া ৪৭৩টি প্লট উদ্ধার ও অবৈধ কাঁচাবাজার উচ্ছেদে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু প্লটগুলো ফের দখল হয়ে যায়।’

অভিযোগে বলা হয়, মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের মোল্লাহ মার্কেটসংলগ্ন ইলিয়াস মোল্লাহর বাড়ির পেছন দিয়ে একসময় তুরাগ নদ প্রবাহিত ছিল। তুরাগ নদের কিছু অংশ ভরাট করে বস্তি তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়রা এটিকে ‘ইলিয়াস মোল্লাহর বস্তি’ হিসেবে চেনে। সেখানে দুই শতাধিক ঘর রয়েছে। ঘরগুলোতে অবৈধ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মিরপুর-১ নম্বরের উত্তর বিশিল মৌজায় গুদারাঘাটের লাল মাঠ এলাকায় ঢাকা চিড়িয়াখানার কর্মচারীদের কোয়ার্টারের জন্য প্রায় দুই একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই জমি ইলিয়াস মোল্লাহর সমর্থকদের দখলে রয়েছে। ২০০৯ সালের ১৩ এপ্রিল অবৈধ দখলদাররা চিড়িয়াখানার কোয়ার্টারের জন্য বরাদ্দ হওয়া জমি অবমুক্তের জন্য ছাড়পত্র দিতে ভূমিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রূপনগর, দুয়ারীপাড়া, মিরপুর-১০ নম্বর সেকশন, পলাশনগর, মানিকদি, ইস্টার্ন হাউজিং, আরামবাগ, মিরপুর-৬ নম্বর সেকশন, ৭ নম্বর সেকশন ও বাউনিয়া সব সব পাড়া-মহল্লার ফুটপাত ও রাস্তার ওপর অস্থায়ী দোকানের ভাড়া ইলিয়াস মোল্লাহর অনুগতদের দিতে হতো। প্রতিটি অস্থায়ী দোকান থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। এসব কাজে পাড়া-মহল্লার ছয় থেকে সাতজনের গ্রুপ কাজ করত। রূপনগর টিনশেড কলোনি নামে পরিচিত এলাকাটিও ছিল ইলিয়াস মোল্লাহর আয়ের আরেক উৎস।

স্থানীয়রা জানায়, ইলিয়াস মোল্লাহর পৈতৃক বাড়ি পল্লবীর হারুনাবাদ এলাকায়। তার বাবা হারুন আল রশীদ মোল্লাহ পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইলিয়াস মোল্লাহ ২০০৫ সালের দিকে পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। তিনি পল্লবী এলাকায় মাছের ঘেরের ব্যবসা করতেন। আসন পুনর্বিন্যাস হলে তিনি ঢাকা-১৬ আসনে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির বেশিরভাগ নেতাকর্মী পলাতক।

হলফনামায় ইলিয়াস মোল্লাহর সম্পদ : ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ইলিয়াস মোল্লাহ তার হলফনামায় মোট বার্ষিক আয় দেখান ২ কোটি ৭৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। ২০২৪ সালের হলফনামায় তার আয় দেখানো হয় ৩ কোটি ১১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ২০১৮ সালে ব্যবসা হিসেবে মাছের চাষ দেখানো হয়েছিল। এরপর দেখানো হয় একটি অ্যাগ্রো ফার্ম, একটি মৎস্য খামার ও একটি বিপণিবিতান। এ ছাড়া দেখানো হয় দুটি বাড়ি ও একটি অ্যাপার্টমেন্ট। তার নামে ৬০ ভরি ও স্ত্রীর নামে ৩২ ভরি সোনা দেখানো হয়েছে। তবে স্থানীয়রা এ সম্পদের হিসাবকে হাস্যকর বলেছেন। তার এ সম্পদের তুলনায় কয়েকশ গুণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত