সম্ভবত ডিসেম্বরেই ভোট

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৫, ০৮:২৯ এএম

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে ইঙ্গিত করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, পলাতক একটি দল দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন কথা বলেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টার দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ‘অপরাধের পরিমাণ মোটেই বাড়েনি’। সাক্ষাৎকারে সংস্কার ও নির্বাচন, ছাত্র নেতৃত্বের নতুন দল গঠনসহ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। কথা বলেছেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়েও। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতির প্রশ্নেও কথা বলেছেন ড. ইউনূস। এ ছাড়া ডিসেম্বরেই ভোট আয়োজনের কথাও উঠে এসেছে তার সাক্ষাৎকারে।

এদিকে গতকাল সোমবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কমিশনার হাজিয়া লাহবিবের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি হাজিয়া লাহবিবকে বলেছেন, ভোট সম্ভবত এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।

বিবিসি বাংলা গতকাল প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে। সাক্ষাৎকারে গত প্রায় সাত মাসে তার সরকারের সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিম-লে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও ইতিবাচক কথা বলেছেন তিনি। ড. ইউনূসের দাবি, দেশ-বিদেশে সরকার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, দেশের মানুষের আস্থা আমাদের ওপর আছে। বিপুল পরিমাণে আছে। কাজেই সেটা হলো বড় প্রমাণ। আমরা কী করছি না করছি এগুলো খুচরো বিষয় আছে। আমাদের খুচরো বিষয় এটাতে ভালো, ওটাতে মন্দ-কিছু ভালো, কিছু মন্দ, হতে থাকবে। এটা একটা অপরিচিত জগৎ, আমরা এসেছি। আমরা কোনো এক্সপার্ট এখানে এসে বসিনি। আমরা এসেছি যার যার জগৎ থেকে, নিজের মতো করে চেষ্টা করছি কীভাবে করতে পারি। তার মধ্যে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। কিছু ভালো করেছে, কিছু ভালো করতে পারিনি। এটা হতে পারে। এটা আমি তো অস্বীকার করছি না।’

বিবিসি বাংলার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম যে এখনই আমরা সংলাপটা শুরু করব। এটাও পারিনি। সংলাপ শুরু হতে হতেও দেরি হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো সময়মতো আমরা করতে চেয়েছি, ওই সময়ে করতে পারিনি। আমরা অনেকগুলো সংস্কার কমিশন করেছি। আমাদের ৯০ দিনের মধ্যে কমিশনের রিপোর্ট দেওয়ার কথা। তারা দিতে পারেনি। আমি অভিযোগ করছি না। কারণ বিশাল একটা কাজ। আরেকটু সময় চেয়েছে এক মাস, দুই মাস। ওইটুকু একটু পিছিয়ে গেছে। এগুলো আর কি। কাজ করতে গেলে যা হয়।’

সংস্কার ইস্যুতে তিনি বলেন, এটির শুরু এখনো হয়নি। অনেকগুলো কমিশন গঠন করা হয়েছে, তারা রিপোর্ট প্রকাশ করবে। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। তবে ইতিবাচক আবহ শিগরিরই দেখা যাবে বলে আশ্বস্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, অপরাধের পরিমাণ মোটেই বাড়েনি। পুলিশ বাহিনী পুরোদমে কাজে ফিরতে কিছুটা সময় লেগেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি থানায় সহজ উপায়ে জনসাধারণকে সেবা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অনলাইনে বেশ কিছু কাজ করা সম্ভব এখন, যা হয়রানি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা এ সময় মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা নিয়েও কথা বলেন। মবের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন কার্যকর নয় তেমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সময় নিচ্ছে (পুলিশ)। তারা প্রস্তুত হয়ে নিয়ে তাদের মানসিকতা থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি। এটা একটা জিনিস হতে পারে। আরেকটা হলো যে, আমরা তাদের বলেছি যেকোনো পুলিশ স্টেশনে তারা যেকোনো রিপোর্ট করতে পারে। আইনের আশ্রয় নিতে পারে এবং সেটাকে আমরা সহজ করেছি এখন। বলছি তোমরা ইন্টারনেটে দিয়ে দিতে পারো, অনলাইন পেজ করতে পারো।’

শেখ হাসিনার সরকার পতনের ঠিক পরে দেশের সর্বস্তরের মানুষের ভেতর এক ধরনের ঐক্য ও মেলবন্ধন দেখা গিয়েছিল। এটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে সমর্থন দিয়েছে, রসদ জুগিয়েছে। সেই জোয়ারে ভাটা পড়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান উপদেষ্টা জানান, ঐক্য এখনো বিদ্যমান। তিনি বলেন, ‘আমার তো অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। কেউ আমাকে অসমর্থন করছে, এরকম কোনো খবর তো আমি পাইনি এখনো।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে অনেক তফাত আছে। কিন্তু তার মানে এই নয়, ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরেছে। এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠনে সরকারি সহায়তার অভিযোগ প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘না, সরকার কোনো সহায়তা করে না। যে রাজনীতি করতে চায়, সে নিজেই ইস্তফা দিয়ে চলে গেছে। তিনজন ছাত্র প্রতিনিধি ছিল সরকারের ভেতরে। যিনি রাজনীতি করতে মন স্থির করেছেন, তিনি ইস্তফা দিয়ে সরকার থেকে চলে গেছেন। উনি প্রাইভেট সিটিজেনশিপে রাজনীতি করবেন, কার বাধা দেওয়ার কী আছে?’

সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা এখনো রয়েছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা। কিছুদিন আগে সেনাপ্রধান দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়া নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন সে প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, ‘এটাতো সবসময় থাকে। একটা পলাতক দল দেশ ছেড়ে চলে গেছে বা তাদের নেতৃত্ব চলে গেছে। তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এটাকে আনসেটেল করার জন্য। এটাতো সবসময় থ্রেট আছেই। প্রতিক্ষণেই আছে, প্রতি জায়গাতেই আছে। কাজেই এটাতো সবসময় থাকবে। তারা মাঝেমধ্যেই ঘোষণা করছে। বক্তৃতা দিচ্ছে। অ্যাড্রেস করছে। আপনি-আমরা সবাই শুনছি। মানুষ উত্তেজিত হচ্ছে।’

তবে দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সবাই মিলে যা ঠিক করবে আমরা সেটিই করব। আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। এই দেশ থেকে কারও অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু যে অন্যায় করেছে, যার বিচার হওয়া উচিত, তার বিচার হতে হবে।’

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের সম্পর্কের কোনো অবনতি হয়নি। আমি যেভাবে ব্যাখ্যা করে এসেছি আমাদের সম্পর্ক সবসময় ভালো থাকবে। এখনো ভালো আছে, ভবিষ্যতেও ভালো থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ভালো না থেকে উপায় নেই। আমাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ, আমাদের পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা এত বেশি এবং ঐতিহাসিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে আমাদের এত ক্লোজ সম্পর্ক, সেটা থেকে আমরা বিচ্যুত হতে পারব না। তবে মাঝখানে কিছু কিছু দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, আমি বলেছি মেঘ দেখা দিয়েছে। এই মেঘগুলো মোটামুটি এসেছে অপপ্রচার থেকে। অপপ্রচারের সূত্র কারা সেটা অন্যরা বিচার করবে। কিন্তু এ অপপ্রচারের ফলে আমাদের সঙ্গে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। সেই ভুল বোঝাবুঝি থেকে আমরা উত্তরণের চেষ্টা করছি।’

নির্বাচনটা এ বছরের মধ্যেই হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা তো সেটা ঘোষণা করে দিয়েছি। আবার নতুন করে বলার তো কিছু নেই।’

নির্বাচন নিয়ে তিনি গতকাল কথা বলেছেন বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কমিশনার হাজিয়া লাহবিবের সঙ্গেও। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় হাজিয়া লাহবিবের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হাজিয়া লাহবিব বাংলাদেশের ক্রান্তিকালে ড. ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আপনি অসাধারণ সময়ে অসাধারণ কাজ করেছেন। আমরা আমাদের সহযোগিতা আরও জোরদার করতে প্রস্তুত।’

তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগে ইইউর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ, যা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। পরিবর্তন আনতে গেলে প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। তাই অনেক কিছু করা দরকার। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে ইইউর সমতা, প্রস্তুতি ও সংকট ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কমিশনার হাজিয়া লাহবিব বলেন, ইইউ এ বছর রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় এবং মিয়ানমারের পশ্চিম রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শিকার জনগণের জন্য ৬৮ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিয়েছে। তবে গত বছরের চেয়ে এই অর্থ বেশি হলেও, ক্রমবর্ধমান তহবিল ঘাটতির কারণে ক্যাম্পগুলোতে মানবিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতির ঝুঁকি এড়ানোর জন্য এটি এখনো যথেষ্ট নয় বলে কমিশনার মন্তব্য করেন।

ইইউ কমিশনারের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনার বাংলাদেশ সফর আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। জাতিসংঘ মহাসচিবও আসছেন। আমরা রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছি।’

ইইউ কমিশনার হাজিয়া লাহবিব বলেন, ‘এ সংকটের একমাত্র সমাধান হলো শান্তি। আমাদের সব ধরনের দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, যার মধ্যে মানবসৃষ্ট দুর্যোগও রয়েছে। ভুল তথ্য (ডিসইনফরমেশন) ছড়ানোও কিন্তু দুর্যোগের মধ্যে পড়ে।’

ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে তারা নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ, জ্বালানি সংযোগ, বন্যা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য ইইউর সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে উত্তরণের পথ সুগম করবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কথা বলি আর এটিই সেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি। নেপাল ও ভুটান দুই দেশই আমাদের কাছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিক্রিতে আগ্রহী।’

ইইউ কমিশনার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার ওপর জোর দেন এবং বলেন, ইইউ বাংলাদেশকে ‘উত্তম অনুশীলন’ ও প্রস্তুতির কৌশল বিনিময়ের জন্য আগ্রহী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত