ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত রাষ্ট্র স্পেন। বর্তমান শাসনব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী দেশটি একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। মুসলমানরা এই দেশ প্রায় ৮০০ বছর শাসন করেছেন। দেশটির রয়েছে সমৃদ্ধ ইসলামি ঐতিহ্য। ফলে এখনো রমজানের আগমন স্পেনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এবং এতে মুসলমানদের ধর্মীয় কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। স্পেনে বসবাসরত মুসলমানের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ। এখানে মুসলমানের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্প্যানিশ ইসলামিক কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তিন দশক আগের তুলনায় প্রায় দশগুণ বেশি।
স্পেনের মুসলিম জনসংখ্যার বড় একটি অংশ মরক্কান। বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ মরক্কান বসবাস করছেন এখানে। স্পেনের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুসারে এখানে বসবাসরত মরক্কানদের সংখ্যা এত বেশি যে, এটি আস্তুরিয়াসের মতো স্প্যানিশ প্রদেশগুলোর জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৮ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত স্পেন ২ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি মরক্কানকে নাগরিকত্ব প্রদান করেছে। তাই মরক্কো ২০২৫ সালের রমজানে মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করতে স্পেনে ৩৮ জন ইসলামি স্কলার পাঠিয়েছে।
স্পেনে বছরের অন্য সময়ের তুলনায় রমজান মাসে মুসলমানদের মধ্যে অধিক ধর্মীয় তৎপরতা লক্ষ করা যায়। পবিত্র এই মাসে মুসলমানরা মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে একত্র হয়ে নামাজ আদায় করেন এবং ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন। এতে বড় পরিসরে তারাবির নামাজের ব্যবস্থা করা হয়। স্পেনের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কারণে মসজিদগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, যাতে বড় সমাবেশের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া ছোট শহরগুলোতে তারাবির নামাজের জন্য কখনো কখনো অস্থায়ী নামাজঘর তৈরি করা হয়। এই মাসটি এক বিশেষ আধ্যাত্মিকতা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মিক বন্ধনের অনুভূতি নিয়ে আসে, যেখানে ইসলামি শিল্প, রীতি ও ঐতিহ্য উদযাপনের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান ও বক্তৃতার আয়োজন করা হয়।
স্পেনের বিভিন্ন শহরে আয়োজিত ‘রমজান নাইট’ উদ্যোগটি মুসলমানদের একত্র হওয়ার এবং এই পবিত্র মাসের ফজিলত ও বরকত ভাগ করে নেওয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। ‘রমজান নাইট’-এর উদ্যোগে ইসলামি সংগীতের আয়োজনও করা হয়, যেখানে ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং রমজানের বিশেষত্ব নিয়ে ইসলামি সংগীত পরিবেশন করা হয়। এতে ইসলামি ঐতিহ্য এবং স্প্যানিশ সংস্কৃতির এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটে। মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, গ্রানাডা, সেভিয়া শহরসহ স্পেন জুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে রমজান পালন করেন। রাতের বেলা ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়।
মুসলমানরা প্রতিদিন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে দলবদ্ধ হয়ে ইফতার করেন। মাদ্রিদের লাভাপিয়েস এবং বার্সেলোনার রাভালের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার রেস্টুরেন্টগুলোতে বিশেষ রমজান মেনু পাওয়া যায়। এসব মেনুতে সাধারণত হারিরা (মরক্কোর স্যুপ), খেজুর, তাজিন ও বাকলাভা জাতীয় খাবার থাকে। মুসলমানরা সাধারণত ঘরেই সাহরি করে থাকেন। তবে কিছু ক্যাফে ফজরের আগ পর্যন্ত খোলা থাকে, যেখানে তারা সাহরির খাবার গ্রহণ করতে পারেন। তারা পুষ্টিকর খাবার দিয়ে সাহরি করেন। তাদের সাহরির মেনুতে ফলমূল, রুটি, ডিম ও দুগ্ধজাত দ্রব্য থাকে। তারা ইফতার করেন পানি ও খেজুর দিয়ে। এছাড়া ইফতারের জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে, মরক্কোর হারিরা, আলজেরিয়ান ব্রিক, স্প্যানিশ সি-ফুড এবং দক্ষিণ এশিয়ান বিরিয়ানি।
স্পেনে রমজান মাসে মুসলমানদের জন্য সরকারি কোনো ছুটির ব্যবস্থা নেই। তবে মুসলিম অধ্যুষিত কিছু এলাকায় রাতের বেলায় বাজার ও রাস্তাগুলো বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অনেক দোকান ও বেকারি গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। সেখানে মিষ্টান্ন, তাজা রুটি ও হালাল মাংস পাওয়া যায়। ইসলামের নানা স্মৃতিবিজড়িত এলাকা গ্রানাডার আলবাইসিনে ইফতারের পর চায়ের দোকান ও হালাল রেস্টুরেন্টগুলোতে ভিড় বেড়ে যায়।
সেভিয়া ও ভ্যালেন্সিয়ার শহরের ইসলামিক কালচারাল সেন্টারগুলো রমজানের রাতগুলোতে কোরআন প্রতিযোগিতা, ইসলামি বক্তৃতা এবং দান-সদকায় উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে। স্পেনে অনেক মুসলিম কর্মী শুক্রবারে জুমার নামাজের জন্য ছুটি পান এবং অনেক স্থানে রমজান মাসেও আগেভাগে কাজ শেষ করার অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে মুসলমানরা তাদের পশ্চিমা জীবনধারার সঙ্গে ধর্মীয় দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন।
