জনদুর্ভোগ এবং মানবকল্যাণ

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৫, ১২:০৩ এএম

সিয়াম সাধনার মাস রমজান চলছে। সব ক্ষেত্রে সংযম সাধনাই রমজানের অন্যতম লক্ষ্য ও বৈশিষ্ট্য। অথচ আমাদের দেশে রমজানে উল্টো চিত্র দেখা যায়। যে যেভাবে পারেন রমজানে টুপাইস কামিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টায় থাকেন। অথচ অন্য দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর প্রতিযোগিতা চলে। আমাদের দেশে এর উল্টো চিত্র। অথচ এ সময়ে নানা ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যানজট তীব্র আকার ধারণ করা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সংকট দেখা দেওয়া, ভেজালের সমারোহ ইত্যাকার নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকে মানুষ। সব কিছু মিলে এক অরাজক অবস্থা। অথচ সংযমের মাস পবিত্র রমজানে সব ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতা ও নীতি-নৈতিকতার উন্মেষ ঘটার কথা।

বরাবরের মতো রমজান আসার আগেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। পেঁয়াজ, আলুসহ সবজির দাম স্বাভাবিক থাকলেও গরুর মাংসে হাতই দেওয়া যায় না। পোলট্রি মুরগির বাজারও আকাশচুম্বী। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রমজানে অত্যাবশ্যক পণ্যসহ অন্য নিত্যপণ্যের মূল্যও। সয়াবিন তেলের জন্য রীতিমতো হাহাকার পড়ে গেছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, যে লেবু ২০-৩০ টাকা হালি সব সময় বিক্রি হয়, বর্তমানে তা ৮০ টাকা! এ ব্যাপারে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ভোক্তাদের পকেট কাটা যাবে, আর প্রশাসনযন্ত্র তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে এটাই কি বাস্তবতা! অন্যদিকে রমজানে টিসিবির কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি। বাজারে সমান্তরাল একটি সরবরাহ ব্যবস্থা থাকলে কোনো সিন্ডিকেটই খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে না। তা ছাড়া নিম্ন আয়ের লোকজন যেন অল্প দামে জিনিসপত্র কিনতে পারে, সেই ব্যবস্থাও চালু রাখা প্রয়োজন। শুধু নামে কার্যক্রম চালালেই হবে না, যথেষ্ট পণ্য যেন মজুদ থাকে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পণ্যের গুণগতমান বজায় রাখাও জরুরি। টিসিবির পণ্য যেন সব জায়গায় পাওয়া যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। রমজান মাসে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। অফিসগামী ও অফিসফেরতদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। শুধু ব্যবস্থাগত ত্রুটি ও অনেক ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে যানজট তীব্র আকার ধারণ করছে। কিন্তু যানজট দূর করতে বাড়তি তৎপরতা চোখে পড়ছে না। যানবাহনগুলো নিয়ম মেনে না চললেও সেগুলো দেখার  যেন কেউ নেই! রমজানে অফিস সময় কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সবাই ইফতার করতে পারেন। কিন্তু সে সময় যদি রাস্তায়ই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে।

দুই

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গণপরিবহন সেক্টরে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ছিল প্রত্যাশিত। এই সরকার সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার নিয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশনও গঠিত হয়েছে। তাই গণপরিবহনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারও ছিল জনাকাক্সক্ষার কেন্দ্রে। কিন্তু পরিবহন খাত নিয়ে কানো সংস্কার কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, গণপরিবহন খাতে সংস্কার তাহলে কবে? গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা দুঃসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে অনেক আগেই। কোথাও যাওয়ার জন্য নাগরিকদের রাস্তায় নেমেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। গন্তব্যে যাওয়ার জন্য তাড়া আছে কিন্তু যানবাহনের তীব্র সংকট। অফিসে যাওয়া, বাচ্চার স্কুল, বিয়ে-দাওয়াত, পার্টিতে যাওয়া, এমনকি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কোনো গন্তব্যেই যে সময়মতো পৌঁছানো যাবে, তার গ্যারান্টি নেই। বাসে উঠতে গেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পাঠাও, ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া অতিরিক্ত। সিএনজিচালিত অটোরিকশা মিটারবহির্ভূত অধিক ভাড়া নিয়েও প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যেতে নারাজ। এ অবস্থায় মানুষজনের ভোগান্তির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।

যানজটের ফলে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। এ ছাড়া এটি একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেওয়ায়, পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া উপায় নেই। যানজট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতিদিনই কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। যানজটে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে দিন দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সব রুটে যাত্রীদের চলাচলে কমপক্ষে ৩ কর্মঘণ্টা সময় অপচয় হয় প্রতিদিন। বিপুল পরিমাণ জ্বালানির অপচয় হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই। বিভিন্ন সময়ে নানামুখী কর্মসূচি-পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়িত হয়েছে খুবই কম। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। অথচ দুবির্ষহ যানজটের জন্য পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার অভাবকেই দায়ী করা হয়। রাজধানীতে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট বাড়ছে না। রাজধানীতে রাস্তার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ যানবাহন বেশি চলছে। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে ২৩০টি নতুন গাড়ি রাস্তায় নামছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, যেকোনো শহরে মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ যান চলাচলের জন্য রাস্তা থাকা আবশ্যক।  ঢাকা শহরের মোট আয়তন ৮১৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার। এ হিসাবে ২০৪ কিলোমিটার রাস্তার প্রয়োজন হলেও ঢাকা শহরে প্রধান রাস্তার পরিমাণ মাত্র ৮৮ কিলোমিটার। এই পরিমাণ রাস্তায় ৫ লাখ যানবাহন চলাচল করছে। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এই পরিমাণ রাস্তায় ২ লাখ ১৬ হাজার যানবাহন চলাচল করার কথা। এর ফলে যানজট এক অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করায় যানজট থেকে মুক্তি পাচ্ছে না রাজধানীবাসী। যানজট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ, প্রাইভেট গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণ, যত্রতত্র পার্কিং নিষিদ্ধ করা, রেল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীপথ এবং ঢাকার ভেতরের খাল দখলমুক্ত করে নৌপথের উন্নয়ন করা, রিকশামুক্ত সড়কসহ নানা পরিকল্পনার কথা বলা হয়। কিন্তু এগুলো নিয়ে কথাবার্তা যতটা হয় কাজ ততটা হয় না যে তা যানজটের বর্তমান হালই বলে দিচ্ছে। যানজট এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নগরবাসীকে যানজট স্থবির ও অচল করে রেখেছে। এই অবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এ জন্য পরিবহন খাতে একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এর অবকাঠামো, সুশাসন, অযান্ত্রিক পরিবহন, পরিবহনের পরিদর্শন ও ব্যবস্থাপনা, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য বন্ধ এবং একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন বিআরটিসিকে আরও গতিশীল করার বিকল্প নেই।

সত্যি বলতে কী, ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক অরাজক অবস্থা বিরাজ করছে। জীর্ণ-শীর্ণ বাসগুলো সিটিংয়ের নামে ‘চিটিং’ করছে যাত্রীদের সঙ্গে। ব্যস্ত সময়ে লোকাল বাসগুলোও হয়ে যাচ্ছে সিটিং বাস। এতে একদিকে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, অন্যদিকে লোকাল বাসে সিটিংয়ের নামে স্বল্প যাত্রী বহন করায় শত শত যাত্রীর অপেক্ষাকে আরও দীর্ঘতর করা হচ্ছে। সেবা নয়, মুনাফাই এদের আসল উদ্দেশ্য। এ অবস্থায় একটি গতিশীল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত বিআরটিসিকে সচল করতে হবে। দেশে যদি সত্যিকার অর্থে গণপরিবহন বলে কিছু থাকত, তাহলে বেসরকারি বাস মালিকরা যে নৈরাজ্যকর অবস্থা তৈরি করতে পারত না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, সুষ্ঠু জনবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠার ক্ষেত্রেও এই চক্র প্রবল বিরোধিতা করছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিসি) বাস চলাচলে চরম অসহযোগিতা করে, পরিবহন খাতে একচেটিয়া প্রাধান্য বজায় রাখছে বেসরকারি পরিবহন ব্যবসায়ীরা।

আসলে মুক্তবাজারের নামে বেসরকারি পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এখন পরিবহন খাতকে জিম্মি করে ফেলেছে। রাজধানীতে প্রায় ২২ হাজার ছোট-বড় বাস চলে। এসবের মালিক মাত্র ২ হাজার মানুষ। অল্প কিছু মানুষ রাজধানীর সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে হলে সারা দেশে বিআরটিসির বাস চলতে দিতে হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যায়। বিশেষ করে রাজধানীতে বাসের সংখ্যা বাড়ানো একান্ত অপরিহার্য। জনস্বার্থে বিআরটিসিকে সচল করা এবং একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক প্যারালাল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকারকে মনে রাখতে হবে, মুষ্টিমেয় লোকের দুর্নীতি, লোভ ও লাভের কারণে গণপরিবহনের নৈরাজ্য আমাদের নিয়তি হতে পারে না। ঢাকার রাস্তায় একই সঙ্গে চলছে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটো, রিকশা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। ফলে এক জগাখিচুড়ি অবস্থার কারণে যানজট এখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য একটি সুসমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো প্রয়োজন। সড়কপথের উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশে নৌপথগুলো চালু করা দরকার। নৌপথে যাতায়াত অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং স্বস্তিদায়ক। এ জন্য বুড়িগঙ্গা, তুরাগসহ অন্য নদীগুলোর দখল-দূষণ বন্ধ করতে হবে। ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার করে সেগুলোতেও নৌরুট চালু করা যায়। গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা এবং যানজট দূর করে স্থবির ঢাকাকে বদলে না দিতে পারলে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তিন

রমজানে যানজট দূর করতে ট্রাফিক বিভাগকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। যেখানে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলে, সেখানে সিটি করপোরেশনের তদারকি জোরদার করতে হবে। যানজট দূর, দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক, ভেজালের রাশ টেনে ধরা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহ ঠিক রেখে জনদুর্ভোগ কমানো এই মুহূর্তের করণীয়। মানবকল্যাণ গুরুত্ব পাক পবিত্র রমজানে এটিই কাম্য।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

drharun. press@gmail. com

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত