খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সুবাতাস

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৫, ০৮:২৫ এএম

অর্থনীতিতে দুটি বিষয়কে পাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর একটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, অন্যটি বেকারত্ব। গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত। কোনো উদ্যোগেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যাচ্ছিল না। অবশেষে এটি কমতে শুরু করেছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। গত ডিসেম্বরেও যা ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। অর্থাৎ, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যে পণ্যটি কিনতে ১০০ টাকা লাগত, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেটির দাম হয়েছে ১০৯ টাকা ৩২ পয়সা।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। এটির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষকে সঞ্চয় ভেঙে চলতে হচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে মানুষ বেশি সংকটে পড়ে। এখন যদি ধীরে ধীরে এটি কমে আসে তাহলে জনজীবনে স্বস্তি মিলবে। খাদ্য পণ্যে যে মূল্যস্ফীতি কমেছে, তার প্রতিফলন বাজারেও দেখা গেছে। সাধারণত অন্যান্য বছর রোজার কিছুদিন আগে ও রোজা শুরুর পরপর বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এবার তেমন ঘটনা চোখে পড়েনি। ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে। এ ছাড়া বেগুন, আলু, পেঁয়াজ, শসাসহ বিভিন্ন কাঁচা পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় অনেক কম। মূল্যস্ফীতি হ্রাসের এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী জুন-জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি কতটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে সে বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি স্বস্তিদায়ক নিঃসন্দেহে। কিন্তু একই সঙ্গে এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, বর্তমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগে ভাটা পড়ছে। কাজেই দীর্ঘ সময় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ধরে রাখা যাবে না। তা ছাড়া মজুরি বৃদ্ধির হার এখনো মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে নিম্নআয়ের মানুষ এখনো স্বস্তি পাচ্ছেন না। কাজেই এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে আগামী দিনের নীতি নির্ধারণ করতে হবে।‘

অন্যদিকে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য পণ্যের ভরা মৌসুম চলছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে যে বিষয়টি এখনো উদ্বেগের তা হচ্ছে, পরপর দুই মাস ধরে খাদ্য বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। সাধারণত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে খাদ্য বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পায়। কিন্তু এখানে তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কাজেই শুধু খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়া নিয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার এ ধারা টেকসই হয় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আরও দু-এক মাস গেলে এ বিষয়ে মূল্যায়ন করা যাবে।’ খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্য পাওয়া গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ। এটি জানুয়ারিতে নেমে আসে ১০ দশমিক ৭২ শতাংশে। আর ফেব্রুয়ারিতে নেমে এসেছে ৯ দশমিক ২৪ শতাংশে। তবে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি আগের মাসের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। খাদ্য বহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। সব মিলে ফেব্রুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আর ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। নভেম্বরে এই মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ গত কয়েক মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার প্রবণতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গতকাল ভোক্তা মূল্যসূচক বা মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এদিকে শহরে ফেব্রুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আর গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ছিল ১০ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে ছিল ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।

বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রমিকের মজুরি হার বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১২ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে কৃষি ক্ষেত্রে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হারে, আগের মাসে এ বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ ছাড়া শিল্প খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ফেব্রুয়ারিতে হয়েছে ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। জানুয়ারিতেও এ হারে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে। সেবা খাতে জানুয়ারি মাসে মজুরি হার সামান্য হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আগের মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত