নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীরের কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৫, ০৬:১৪ এএম

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় বিপুলসংখ্যক পোস্টার সাঁটানোর পাশাপাশি অনলাইনে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সম্প্রতি নতুন করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের কর্মসূচি ‘মার্চ ফর খিলাফত’ ঘিরে চলছিল নানা আলোচনা-সমালোচনা। তবে দুদিন আগে থেকেই এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না জানিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে হুঁশিয়ার করা হয়েছিল। অবশ্য শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ এ সংগঠনের কর্মীদের মাঠে নামা ঠেকাতে পারেনি পুলিশ। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে পুলিশি বাধা উপেক্ষা করেই মিছিল বের করে হিযবুত কর্মীরা।

সিপিবি কার্যালয় পার হয়ে পল্টন ধরে বিজয়নগরের দিকে যাওয়ার পর পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে শুরু করলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় পুলিশের ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেলের ছাড়াও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যায়, যা ভেসে আসছিল মিছিলে অংশ নেওয়া জমায়েতের দিক থেকে।

জুমার নামাজ শেষ হওয়ামাত্রই বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের সামনের সড়ক ও সিঁড়ির ওপর নামাজে অংশ নেওয়া হিযবুতের কর্মীরা স্লোগান দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তারা হাতে তুলে নেয় কালিমা খচিত ব্যানার। মিছিলটি শুরুর সময় থেকে পুলিশের যে দলটি তাদের বাধা দিতে যায়, তাতে দশজন পুলিশ ছিল। বিরাট মিছিলের তোড়ে পুলিশের দলটি পেছাতে পেছাতে একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দেয়। পল্টন মোড়ে থাকা পুলিশের আরেকটি দল সামনে এগিয়ে এসে মিছিলকারীদের ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে।

পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী এক মুসল্লি বলেন, ‘ওরা (মিছিলকারীরা) এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছিল যে, ভেতরের সব সাধারণ মুসল্লিও জিম্মি হয়ে পড়েছিল। মিছিলটির শুরুতেই যদি পুলিশ অ্যাকশনে যেত তাহলে অনেক সাধারণ মুসল্লিও ভুক্তভোগী হতো। ওরা যখন উত্তর গেট থেকে একটু সামনে পল্টনের দিকে এগিয়ে গেছে, তখন আমরা ভেতরে থাকা মুসল্লিরা নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ পাই।’

মিছিলে অংশ নেওয়া সায়েম নামে এক তরুণের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তিনি বলেন, ‘আমরা খিলাফত কায়েমের জন্য এখানে এসেছি। আমি দনিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আমার সঙ্গে আরও অনেকেই এসেছে।’ তবে তারা খিলাফত বলতে কী চান এমন প্রশ্নের কোনো পরিষ্কার জবাব দিতে পারেননি।

মিছিলটির সম্মুখভাগ যখন বিজয়নগর পানির ট্যাংকির কাছাকাছি তখন পল্টন মোড়ের কাছাকাছি থাকা পুলিশ সদস্যরা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে হিযবুত কর্মীদের মিছিলে লাঠিপেটার পাশাপাশি টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। তখন মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মিছিলকারীরা অলিগলিতে ঢুকে পড়লে লাঠি হাতে তাদের তাড়া করতে দেখা যায় পুলিশকে। এর মিনিট দশেক পর ফের সংগঠিত হয়ে মূল সড়কে উঠে পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান নেয় হিযবুত কর্মী ও সমর্থকরা। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাসদস্যদের একটি দল পুলিশের সহায়তায় এগিয়ে এসে মৃদু লাঠিপেটা করে মিছিলকারীদের। এতে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। শুরু থেকে দফায় দফায় মিছিল থেকে এক, দুজন করে আটক করতে দেখা যায়। তবে ঠিক কতজনকে আটক করা হয়েছে, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শাহরিয়ার আলী গতকাল রাত ৮টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরো ঘটনায় আমাদের হাতে ১১ জন আটক হয়েছে। এ ছাড়া মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটও অনেককেই আটক করেছে। মোট সংখ্যাটা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।’

এ সংঘাতের মধ্যে পড়ে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ও পুলিশের একজন কনস্টেবল আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন দৈনিক কালবেলার অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদক সুশোভন সরকার অর্ক। তাকে হাসপাতালে নিয়ে এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো হয়। একই সময় সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেলে আহত হন ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের চিত্রসাংবাদিক সৌরভ লস্কর। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অর্কের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী আতাউর রহমান বলেন, ‘অর্কর তলপেটে গুলি বা স্পিøন্টার জাতীয় কিছুর আঘাতে গভীর ক্ষত হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের একদল চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আপাতত বিপদমুক্ত ঘোষণা করেছেন তাকে।’

পুলিশ সদস্য আহতের বিষয়ে জানতে চাইলে মতিঝিল জোনের ডিসি বলেন, ‘আমাদের এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন। তার হাতে সামান্য আঘাত লেগেছে। এটা বড় কিছু নয়।’

হিযবুত সদস্যদের প্রতিহত করতে যোগ দেয় জনতাও : পুলিশ যখন লাঠিপেটা, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডে হিযবুত কর্মীদের প্রতিহতের চেষ্টা করছিল, তখন তাদের সঙ্গে অনেক পথচারীকেও অংশ নিতে দেখা যায়। তাদেরই একজন পেশায় দিনমজুর আরমান রহমান। দুপুর থেকেই বেশ আলোচনায় ছিলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে তাকে পল্টন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে হিযবুত তাহরীরের এক কর্মীকে প্রতিহত করতে দেখা যায়। পরে আরমানকে সেখান থেকে আটক করেন একটি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ওই ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তার মুক্তি চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিতে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আরমানকে ছাড়িয়ে নিতে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে যান। তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় উপদেষ্টার গাড়িতেই। এ প্রসঙ্গে ফেসবুকে নিজের ভেরিফাইড পেজে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ লেখেন, ‘মামার নাম আরমান, উনি রিকশাওয়ালা না। আগে রিকশা চালাতেন। পুলিশকে সহায়তা করতে গেলে তার ওপরেও হামলা করে আহত করা হয়। পরবর্তীতে আর্মির সদস্যরা তাকে অ্যারেস্ট করে ডিবিতে সোপর্দ করেন। তাকে ছাড়িয়ে এখন ঢাকা মেডিকেলে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে।’

নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুতের ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচি প্রতিহতে দুদিন আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল দুপুরেও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘হিযবুত তাহরীর একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন। আইন অনুযায়ী এদের সব কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর উত্তরা ১১ ও ১২ নম্বর সেক্টর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হিযবুত তাহরীরের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তাদের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল জুমার নামাজের দুই ঘণ্টা আগে থেকেই বায়তুল মোকাররমের ফটকগুলোতে অবস্থান নেন র‌্যাব, পুলিশ ও সেনাসদস্যরা। বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের মধ্যে যারা ব্যাগ হাতে আসেন, তাদের তল্লাশি করেন পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। কারও কারও কাছে পরিচয় ও আরও কিছু তথ্য জানতে চান তারা। র‌্যাব-পুলিশের সদস্যদের হাতে গ্যাসগান, শটগানসহ দাঙ্গা দমনের সরঞ্জাম দেখা যায়। আশপাশে পুলিশের সাঁজোয়া যান এবং জলকামানের গাড়িও মোতায়েন করা হয়েছিল।

আ.লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে দাবি গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের : হিজবুত তাহরীর আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আবারও দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের নেতারা। তারা হিজবুত তাহরীরের মিছিলে অংশ নেওয়া সবাইকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত সমাবেশে সংগঠনটির নেতারা এমন মন্তব্য করেন। এ সময় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব জাহিদ আহসান, ঢাবি আহ্বায়ক আব্দুল কাদের, কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদ্দাসসি চৌধুরী, ঢাবির মুখ্য সংগঠক হাসিবুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মুখপাত্র আশরেফা খাতুন এবং ঢাবির মুখপাত্র রাফিয়া রেহনুমা হৃদিসহ অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত