ক্রিকেটের সঙ্গে শুভ্রতার নিবিড় যে সম্পর্ক সেটা টেস্ট ম্যাচের। তবে সাদা বল আর রঙিন জার্সির ক্রিকেটেও শ্রেষ্ঠত্বের যে শুভ্র প্রতীক, সেটা আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সাদা কোট। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ঠিক বিশ্বকাপ নয়, তাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের দাবিদার হওয়া যায় না এই শিরোপা জিতে। কিন্তু কখনো কখনো বৈশ্বিক শ্রেষ্ঠত্বের বাইরেও এমন কিছু স্মারক থাকে, যা অর্জনের জন্য সর্বস্ব বাজি ধরা যায়, যাকে বলে ‘অল অন দ্য লাইন’, এবারের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ট্যাগলাইন। সেই সাদা কোটের জন্যই ভারতের ‘মেন ইন ব্লু’ আর নিউজিল্যান্ডের ‘ব্ল্যাকক্যাপ’ আজ মাঠে নামবে, দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।
একদিকে রোহিত শর্মা, আইসিসির সবগুলো পুরুষ আসরের ফাইনালে খেলা একমাত্র অধিনায়ক। ওয়ানডে বিশ্বকাপ, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ; দুটোরই ফাইনালে হেরেছেন। আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সবশেষ আসরের ফাইনালেও হার, যদিও অধিনায়ক হিসেবে নয়। অবশেষে জিতেছেন ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। অন্যদিকে মিচেল স্যান্টনার, অধিনায়ক হওয়ার পর প্রথম আইসিসি আসরের দলকে তুলে এনেছেন ফাইনালে। প্রসঙ্গ যখন ফাইনাল, মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের ফাইনাল ভাগ্য কিন্তু খুবই খারাপ। এখন পর্যন্ত দুটো বিশ্ব আসরের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে দুই দল, ২০০০ সালের নকআউট বিশ্বকাপ যা চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পূর্বসূরি। অন্যটি ২০২১ সালের আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। দুই ফাইনালেই হেরেছে ভারত। ২৫ বছর আগে, নাইরোবির জিমখানা মাঠে, সৌরভ গাঙ্গুলির সেঞ্চুরির পিঠে ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরি করেছিলেন ক্রিস কেয়ার্নস। ২১ বছর ধরে সেই শিরোপাই ছিল কিউইদের একমাত্র বৈশ্বিক ট্রফি। ২০২১ সালে বিরাট কোহলির নেতৃত্বে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠে আসা ভারতকে হারিয়েছিল কেন উইলিয়ামসনের নিউজিল্যান্ড। কেনিয়ার সেই ফাইনালের সিকি শতাব্দী পর আরেকটা ওয়ানডে ফাইনাল, ফের মুখোমুখি ভারত-নিউজিল্যান্ড। মাঠের সেদিনের চেহারাগুলোর বেশিরভাগই এখন মাইক্রোফোন হাতে ধারাভাষ্য কক্ষে না হয় টিভি চ্যানেলে বিশেষজ্ঞের ভূমিকায়। কী হবে, কী না হবে এই নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন হরদম। তবে তাদের অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন ২২ গজের অভিজ্ঞতা, ওখানে কোনো ভবিষ্যদ্বাণীই যে কাজে আসে না!
ভারতের পক্ষে ম্যাচের আগের দিন সংবাদ মাধ্যমে কথা বলেছেন শুবমান গিল, দলটির সহ-অধিনায়ক। অল্পদিনের ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় বারের মতো কোনো বড় আসরের ফাইনালে খেলছেন। শুবমান জানালেন, তাদের কাছে আজকের ম্যাচটা অন্য আরও একটা ম্যাচের মতোই, ‘বড় ম্যাচের চাপ তো থাকবেই। তবে গত ম্যাচের দিকে যদি দেখি, অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের এমন পরিস্থিতিতে বল করার অভিজ্ঞতা ছিল না, চাপের মুখে তারা খেই হারিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যে দল চাপ ভালো সামলায় তারাই ভালো করে। যারা উপলক্ষটাকে ভুলে গিয়ে চাপটা ভুলে থাকতে পারে, তাদের ভালো করার সুযোগ বেশি। এটা বলা সহজ, তবে যখন খেলতে নামব তখন অল্পতেই এই ভাবনা মনের ওপর আসবে। ভালো দল তারাই যারা এই ভাবনাকে দূরে ঠেলে অন্য একটা ম্যাচ মনে করেই খেলতে পারবে।’
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে শুরুতে চাপেই ছিল ভারত। একই প্রতিপক্ষের সঙ্গে ফাইনালে সেই ভুল আর করতে চান না শুবমান, ‘ওদের (নিউজিল্যান্ড) বিপক্ষে গত ম্যাচে পাওয়ার প্লে’তে ৩ উইকেট হারানোর পরও আমরা ভালো করেছিলাম, আমরা ভালোভাবেই জিতেছিলাম। তাই ফাইনালের আগে বাড়তি কোনো আলাপের প্রয়োজন নেই। তবে উইকেট অবশ্যই আলাপের বিষয়, যে উইকেটে আমরা খেলছি সেটা পাকিস্তানের উইকেটের চেয়ে আলাদা। তবে এখানে যেহেতু ৪টা ম্যাচ খেলেছি, বাড়তি আলোচনার প্রয়োজনই নেই।’
একই ভেন্যুতে ভারত সবগুলো ম্যাচ খেলেছে বলে বাড়তি সুবিধা পাবে, এমনটা মনে করেন না কেন উইলিয়ামসন। সংবাদ সম্মেলনে এই ব্যাটসম্যান বলেছেন, ‘এটা মেনেই তো খেলা হচ্ছে, তাহলে বাড়তি কথা কেন। আমাদের লক্ষ্য পরের ম্যাচ, প্রতিপক্ষ, উইকেট। আমাদের পরের প্রতিপক্ষ ভারত, ওদের বিপক্ষে একই মাঠে আগে একবার খেলেছি। আমাদের উচিত হবে সেই ম্যাচের ইতিবাচক দিকগুলো নেওয়া। (সেমিফাইনাল খেলার) দুই তিন দিনের মধ্যেই ফাইনাল খেলতে হচ্ছে, আমাদের সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে।’
ফাইনালের আগে ব্ল্যাকক্যাপদের জন্য দুঃসংবাদ, সেমিফাইনালে হেনরিক ক্লাসেনের ক্যাচ নিতে গিয়ে কাঁধে চোট পেয়েছেন ম্যাট হেনরি, আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। তার বদলে হয়তো একাদশে আসতে পারেন জ্যাকব ডাফি। এই আসরে যার একটা ম্যাচেও খেলা হয়নি। অন্যদিকে ভারত সম্ভবত অপরিবর্তিত একাদশই নামাবে।
শীর্ষ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলা দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা ভারতের, প্রায় দেড়শ কোটির দেশ। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের জনসংখ্যা সবচেয়ে কম, মাত্র সাড়ে ৫২ লাখ। অবাক হলেও সত্যি, এই দুইটা দেশই ২০১১ থেকে আইসিসি আসরগুলোতে সবচেয়ে ধারাবাহিক। এই দুই দল সবচেয়ে বেশিবার নকআউট পর্বে খেলেছে। ১২টা সেমিফাইনাল খেলে ভারত জিতেছে ৩টা শিরোপা, ৫ বার রানার্স আপ আর ৪ বার সেমিফাইনাল। নিউজিল্যান্ড ১টা শিরোপা, ৩ বার রানার্স আপ আর ৪ বার সেমিফাইনালে বিদায়। জনসংখ্যার ঘনত্ব আর ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্ব যে সবসময় হাত ধরাধরি করে চলে না, এই পরিসংখ্যানই তার বড় প্রমাণ। ভারতের আছে প্রচুর ক্রিকেটারের সরবরাহ, সামাজিক আকাক্সক্ষা আর অঢেল অর্থের হাতছানি। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডে ক্রিকেট খেলাটাই প্রধান খেলা নয়, মানুষও খেলাটাকে ধর্মের পর্যায়ে নয়, বিনোদন হিসেবে দেখে। ঘরোয়া কাঠামো খুব যে শক্ত এবং আকর্ষণীয় সেটাও নয়। তবুও তাদের সাফল্যের পেছনে বড় কারণ তারকা সংস্কৃতির অনুপস্থিতি, নির্দিষ্ট কারও ওপরে অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা না রাখা। আজ দেড়শ কোটির প্রার্থনা আর সাড়ে ৫২ লাখের শুভ কামনার অদৃশ্য লড়াই। যে লড়াইয়ের জয়ী দল শিরস্ত্রাণ নয়, পাবে সাদা কোট। সঙ্গে ২.২৪ মিলিয়ন ডলার। উত্তেজনাটা উসকে দিতে আর কী চাই!
