নারীর ওপর হামলা নতুন বাংলাদেশ স্বপ্নের বিপরীত

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৫, ০৬:৫২ এএম

সম্প্রতি নারীদের ওপর ঘৃণ্য হামলার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘নতুন বাংলাদেশে’র যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, এটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা এই ‘নতুন বাংলাদেশে’ নারী-পুরুষ সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা আমাদের সব শক্তি প্রয়োগ করে এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করব।’

নারীবিরোধী যে শক্তি মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাকে দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অবশ্যই মোকাবিলা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

গতকাল শনিবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৫ উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘পতিত স্বৈরাচার দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। আমাদের এখন ততটাই সতর্ক থাকতে হবে, যেমনটা আমরা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা রক্ষায় সর্বোচ্চ সজাগ থাকুন। নিপীড়নের বিরুদ্ধে সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলুন। একে অন্যের পাশে দাঁড়ান। একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে সরকারকে সহযোগিতা করুন।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা মিলে যে অসাধ্যসাধন করেছে, তার সম্মুখসারির ভূমিকায় ছিল এ দেশের নারীরা। ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রাণঘাতী অস্ত্রের সামনে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়েছিল আমাদের মেয়েরা।’

‘গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে থাকলেও সমাজে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা পিছিয়ে আছে। নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সরকার সব সময় সচেষ্ট। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ চলমান। দুস্থ মায়েদের আর্থিক সহায়তা প্রদান, নারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি, কর্মজীবী নারীদের থাকার হোস্টেল, ডে কেয়ার সেন্টার সুবিধাসহ নানা ধরনের উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকার নিচ্ছে। আরও কী কী করা যেতে পারে, সেটা নিয়েও আলোচনা চলছে,’ বলেন তিনি।

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘অনেক সময় নারীরা নির্যাতনের শিকার হলেও তারা বুঝতে পারেন না কোথায় অভিযোগ জানাবেন। নারীরা যেন তাদের অভিযোগ জানাতে পারেন, সেজন্য হটলাইন চালু করা হয়েছে। আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য আমরা পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছি। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, ২০২৫ প্রণয়নের কাজও আমরা হাতে নিয়েছি। আমরা একটি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন করেছি, তারাও তাদের সুপারিশগুলো দেবে।’

প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যের শুরুতেই ‘অদম্য নারী পুরস্কারে’ ভূষিত বিশিষ্টজন এবং স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, চাকরিজীবী, শ্রমজীবী, গৃহিণীসহ সব পেশার, সব বয়সের নারীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। এ ছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ, বিশেষ করে বীরাঙ্গনাসহ একাত্তরে সংগ্রামী নারী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মেয়েরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শত বাধা পেরিয়ে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সার্বিকভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে অবদান রাখছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক দিন আগে তারুণ্যের শক্তিকে উজ্জীবিত করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশ জুড়ে আয়োজিত “তারুণ্যের উৎসব ২০২৫”-এ রেকর্ডসংখ্যক নারীরা ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, বাস্কেটবল ইত্যাদি খেলায় অংশ নিয়েছে। এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ২৭ লাখ ৪০ হাজার মেয়ে প্রায় তিন হাজার খেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশ নেয়। এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ দর্শকসারিতে বসে তাদের উৎসাহ জুগিয়েছেন। হাজার হাজার দর্শকের এমন উপস্থিতিই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সমাজে নারীর অধিকার ও অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠায় পুরুষদেরও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন রয়েছে।’

‘আমাদের সমাজে এখনো এমন বহু মানুষ আছে, যারা নিপীড়িত নারীদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে তাদের খাটো করে দেখে, অবজ্ঞার চোখে দেখে। অথচ নারীর প্রতি সহিংসতা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হলে বৈষম্যহীন, সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে হলে নারীর পাশে দাঁড়ানোর, তাদের সমর্থন জানানোর, কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সমাজে নারীকে খাটো করে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। তা না হলে আমরা জাতি হিসেবে এগোতে পারব না,’ যোগ করেন প্রধান উপদেষ্টা।

আজকের বিশ্বে নারীরা যতটুকু অধিকার আর স্বাধীনতা চর্চা করতে পারছেন, এর পুরোটাই তাদের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা হয়েছিল নারীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। নিউইয়র্কের নারীশ্রমিকরা কর্মঘণ্টা কমানো, বেতন বৃদ্ধি ও ভোটের অধিকারের দাবিতে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নামেন। অধিকার আদায়ের জন্য আহত ও নির্যাতিত হন। বাংলাদেশেও নারীরা ন্যায্য অধিকারের জন্য যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম করে এসেছেন। তেভাগা থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধে বাংলার নারীসমাজ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

‘ইতিহাসের অনেক বীর নারীকে আমরা ভুলে গেছি, তাদের অবদানের কথা জানি না। কিন্তু জুলাই কন্যাদের নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের কথা আমরা কিছুতেই ভুলে যেতে দেব না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া নারীরা বিভিন্ন সময় আমাকে তাদের সংগ্রাম ও আশা-আকাক্সক্ষার কথা জানিয়েছে। আমরা যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, নারীদের অংশগ্রহণ ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া তা সম্ভব হবে না। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীদের সঙ্গে পুরুষদেরও সহযোদ্ধা হয়ে কাজ করতে হবে,’ বলেন ড. ইউনূস।

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের নতুন করে নারীদের সংগ্রামের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, অনুপ্রেরণা আর সাহস জোগায়। সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় যারা কাজ করছেন, তাদের প্রতি আহ্বান জানাই, যত বাধাই আসুক না কেন ইতিহাস আমাদের যে সুযোগ করে দিয়েছে, সে সুযোগ আমরা পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করবই। আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়বই। এই আমাদের প্রতিজ্ঞা।’

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে অদম্য নারী পুরস্কার তুলে দেন প্রধান।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিজয়ী অদম্য নারীদের চিহ্নিত করে তাদের সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে অগ্রসর হওয়ার পথ সুগম করার উদ্দেশ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অদম্য নারী পুরস্কার কর্মসূচিতে সম্মাননা প্রাপ্তরা হলেন অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ময়মনসিংহ বিভাগের শরিফা সুলতানা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী সিলেট বিভাগের হালিমা বেগম, সফল জননী নারী রংপুর বিভাগের দিনাজপুরের মেরিনা বেসরা, নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবনসংগ্রামে জয়ী নারী হিসেবে ঢাকা বিভাগের ফরিদপুরের লিপি বেগম, সমাজ উন্নয়নে অবদানের জন্য মো. মুহিন (মোহনা) এবং বিশেষ সম্মাননা ক্যাটাগরিতে জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের অদম্য নারীদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

এই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ এনডিসি।

চার মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সেবা ডিজিটাইজড করার নির্দেশ : প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চারটি মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমসহ নাগরিক সেবা ডিজিটাইজড করার নির্দেশ দিয়েছেন।

মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ভূমি, এনবিআর, বাণিজ্য এবং বিআরটিএ। গতকাল বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা।

এই লক্ষ্য অর্জন করার জন্য মন্ত্রণালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ কর্মপদ্ধতি অটোমেশন করা, শতভাগ ইলেকট্রনিক ফাইল ব্যবহার এবং শতভাগ এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং নিশ্চিত করাসহ ডিজিটাল সিগনেচার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

সেবা সহজীকরণের জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যকার ডেটার আন্তঃক্রিয়াশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত