আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই মুমিনের লক্ষ্য

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৫, ০৪:০৭ এএম

দৈনন্দিন জীবনে আমরা কত কাজই না করি। চলাফেরা থেকে শুরু করে চাকরিবাকরি, ব্যবসাবাণিজ্যসহ অনেক কাজ। পাশাপাশি ইবাদাত-বন্দেগিও করি। কিন্তু আমাদের সব কাজ কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য হয়ে থাকে? আমরা কি কখনো এ বিষয়টি চিন্তা করেছি? পবিত্র কোরআনের সুরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘বলুন আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবকিছু একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ^ জগতের প্রতিপালক।’ মুমিনের জীবনের লক্ষ্য কী হতে পারে তা পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়। মুমিনের লক্ষ্য ও উদ্দেশের বিষয়ে একই সুরার ৭৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃত মুমিনরা বলবে, আমি একনিষ্ঠভাবে তার দিকে মুখ ফেরাচ্ছি, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আর আমি মুশরেকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’

আমাদের সব ভালো কাজ যদি আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য হয়ে থাকে তাহলে মনে কোনো প্রকার দুঃখ থাকে না। কিন্তু তা যদি অন্যের সন্তুষ্টির উদ্দেশে কিংবা মানুষের বাহবা পাওয়ার জন্য হয়ে থাকে তবে তাতে যেমন মানুষকে খুশি করা সবসময় সম্ভব হয় না, তেমনি মনেও কষ্ট পেতে হয়। আর মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করা কোনো মুমিনের লক্ষ্য থাকাও উচিত নয়। আমি আপনি যতই তোষামোদি কিংবা মানুষের সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিই না কেন, আল্লাহর কাছে সেটার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। বরং আল্লাহই আপনার ভালো কাজে সন্তুষ্ট হবেন। তিনিই ভালো কাজের পুরস্কার দুনিয়া ও আখেরাতে দেবেন। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলেই জীবন ধন্য।

আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন প্রশংসা না করলে খুশি হন না কিংবা প্রচার না পেলে দুঃখ করেন। এটা ঠিক নয়। হ্যাঁ, আমার একটি ভালো কাজ যদি প্রচারের কারণে অন্যরা উদ্বুদ্ধ হন, তবে তাতে দোষের কিছু থাকে না। কিন্তু কাজটি হওয়া উচিত আল্লাহকে খুশি করার জন্য। তিনি যদি খুশি হয়ে যান তাহলে আপনি সফল। মুমিনদের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহকে খুশি করার চেয়ে বড় তৃপ্তির কাজ আর নেই। তাকে সন্তুষ্ট করতে পারলে সেটিই হবে একজন মুমিন মুসলমানের জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। এই রমজানে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে ইবাদত-বন্দেগি এবং ভালো কাজগুলোর চর্চা বাড়াতে পারি। যাতে পরবর্তী সময়গুলোতে এই ভালো কাজের ধারাবাহিকতা থাকে।

যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে তার জন্য আখেরাতের সফলতা অবধারিত হয়ে যায়। শুধু আখেরাতের সফলতাই শেষ নয়; বরং যে মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য নেয় সঙ্গে সঙ্গে তার জাগতিক জীবনও কল্যাণ ও বরকতময় হয়। আল্লাহ তার চলার পথকে সহজ করে দেন। তার জন্য রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন।

মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে আমাদের নেক আমল করতে হবে। যে কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সেই ধরনের কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। আমাদের সব কাজে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশিত পথ ও মতকে প্রাধান্য দিতে হবে। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গঠন করতে হবে। নিজের ধারণার বশবর্তী না হয়ে মহান আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধকে মেনে জীবনযাপন করতে পারলে দুনিয়া ও আখেরাতে আমরা সফলতা অর্জন করতে পারব।

এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! নিশ্চয় ইসলামের বিধানগুলো আমাদের ওপর আধিক্যতা লাভ করেছে। তাই আমাদের এমন এক ব্যাপক বিষয় শিক্ষা দিন, যা আমরা আঁকড়ে ধরব। উত্তরে তিনি বললেন, তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর স্মরণে ভেজা থাকে।’ (সুনানে ইবন মাজাহ) পাশাপাশি যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে। আল্লাহর ভয় নিয়ে কাজ করতে পারলে সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে তার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হবে।

আল্লাহর হুকুম এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী আমল করলে সে আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে। দুনিয়ার যশ-খ্যাতি ও অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়া, ভালো চাকরি করা, ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ দক্ষ হওয়া, এগুলোর কোনোটিই তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন তিনি জিবরাইল (আ.)-কে ডেকে বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন। কাজেই তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন জিবরাইল (আ.)-ও তাকে ভালোবাসেন এবং জিবরাইল (আ.) আকাশের অধিবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন। কাজেই তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আকাশের অধিবাসী তাকে ভালোবাসতে থাকে। অতঃপর পৃথিবীতেও তাকে সম্মানিত করার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি)

একজন ইমানদারের সর্বশেষ ঠিকানা এবং চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তির জায়গা হলো জান্নাত। জান্নাতের অধিবাসীদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ জান্নাতিদের ডেকে বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? তারা জবাব দেবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদের যে অপরিসীম নেয়ামতে ধন্য করেছেন, তাতে কী করে আমরা অসন্তুষ্ট থাকতে পারি! তখন আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাদের এর চেয়েও উত্তম নেয়ামত দেব। তা হলো, এখন থেকে আমি তোমাদের প্রতি চিরসন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। আর কখনো অসন্তুষ্ট হবো না।’ (সহিহ বুখারি)

আমরা যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে সঠিকভাবে জীবনযাপনের মাধ্যমে তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি, মহান আল্লাহ আমাদের সেই তওফিক দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত