বাফুফের মার্কেটিং কমিটির দায়িত্ব আপনার কাছে। এটা নিয়েই শুরু করি। র্যাংকিংয়ের ১৮৫তম দেশের ফুটবলকে বিপণন করা নিশ্চয় সহজ নয়। সেটা করতে গিয়ে কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন?
ফাহাদ করিম : প্রথম সমস্যা হচ্ছে সামগ্রিকভাবে ফুটবলের একটা ইমেজ সংকট ছিল। যে কোনো কারণেই হোক মানুষ ফুটবলে বিনিয়োগ করতে চায় না। বাফুফের ইমেজ সংকট কাটানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এটা অবশ্য আমি এবং কমিটির অন্যরা আগেই জানতাম। নির্বাচনের সময় বলেছিলাম, প্রথম কাজ হবে ফুটবলের ইমেজ সংকট কাটানো। স্পনসর-পার্টনারদের কাছে যখন যাই তখন তারা একটা দ্বিধার মধ্যে থাকে, এটা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেটাকে ধীরে ধীরে আমরা ওভারকাম করেছি। প্রথমত বাফুফের নতুন নেতৃত্ব এটাকে আমরা বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে চেয়েছি বিশ্বাস আদায় করতে। আমি একই সঙ্গে ডিজিটাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট কমিটিরও চেয়ারম্যান। আমাদের ফেসবুক পেইজটা ভীষণ নিষ্ক্রিয় ছিল। প্রথম নির্বাহী সভার দিন (৯ নভেম্বর) আমাদের ফেসবুক ফলোয়ার ছিল মাত্র সাত লাখ। গতকাল ছিল ১.২ মিলিয়ন! আগে মানুষ জানতই না বাফুফে কী কী কাজ করত। কোনো পরিষ্কার ধারণা ছিল না এ প্রজন্মের কাছে। স্পন্সর-পার্টনারদের কাছে বাফুফের কর্মকা-গুলো পৌঁছাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকা জরুরি। সক্রিয় হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মানুষের ধারণা বদলে যায়।
মার্কেটিংয়ে ধারাবাহিকতার বড় ব্যাপার। কিছুদিন কাজ করলেন, হাত-পা গুটিয়ে রাখলেন। তাহলে তো হবে না। এক্ষেত্রে আপনার লক্ষ্যটা কী?
ফাহাদ করিম : শর্ট টার্ম পরিকল্পনা ছিল জাতীয় দলের জন্য একটা কিট স্পন্সর আনা। ফিফার সদস্যদের অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে আমরা ছিলাম, যাদের কোনো কিট স্পন্সর ছিল না। দ্বিতীয়ত, ছেলেদের জাতীয় দলের জন্য স্পন্সর আনা যেটাও বহুদিন ছিল না। তৃতীয়ত, নারী দলের যে স্পন্সর ছিল (ঢাকা ব্যাংক) তাদের সঙ্গে চুক্তির অঙ্ক নিয়ে কথা বলা কিংবা অন্য কোনো স্পন্সর খুঁজে আনা। আলহামদুলিল্লাহ, এই তিনটাই আমরা অল্প সময়ে করতে পেরেছি। এছাড়া চলমান লিগকে রি-ব্র্যান্ডিং করার পরিকল্পনা আছে।
বিগত ১৬ বছরে জেলার ও প্রান্তিক পর্যায়ের লিগ ছিল অবহেলিত। অথচ সেগুলো নিয়মিত হলে খেলোয়াড় সংকট অনেকটা কমে যেত। এই জায়গাটায় আপনারা দৃষ্টি দেবেন কি না?
ফাহাদ করিম : আমাদের সভাপতি একটা বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে ফুটবলকে তিনি মতিঝিল পাড়ায় সীমাবদ্ধ রাখবেন না। ফুটবলকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেবেন। তার জন্য তিনটি উদ্যোগ নিয়েছেন। ছেলেদের জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৭ ও জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু করা। একে প্রান্তিক পর্যায়ে ফুটবল নিয়মিত, একই সঙ্গে স্কাউটিং করা সহজ হবে। অনূর্ধ্ব-১৯ শুরু হয়েছে। জুন-জুলাইয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ শুরু হওয়ার কথা। নারীদেরও জাতীয় নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ হবে। তবে সেটি হবে ক্লাবভিত্তিক আটটি বিভাগের প্রতিটি থেকে চারটি করে ক্লাব নিয়ে মোট ৩২টি ক্লাব তিন মাসব্যাপী এ টুর্নামেন্টে খেলবে। এই তিনটি টুর্নামেন্ট যদি নিয়মিত করতে পারি, তবে বেশ কার্যকর হবে। এই আসরগুলো পাইপলাইন হিসেবে কাজ করবে।
আর জেলার লিগ?
ফাহাদ করিম : আমাদের একটি জেলা ফুটবল লিগ কমিটি করা হয়েছে। আমরা কমপক্ষে ১০টা জেলা নিয়ে শুরু করব। ধীরে ধীরে এটা দেশব্যপী নিয়ে যাব। উচ্চাভিলাষী কোনো কিছু আমরা করতে চাই না। আমরা ছোট ছোট প্রতিশ্রুতি দিতে চাই যা পূরণযোগ্য। কীভাবে, কাদের নিয়ে হবে সেটা জেলা লিগ কমিটি ঠিক করবে। তবে অগ্রাধিকার পাবে যেসব ডিএফএ প্রস্তুত আছে এবং যাদের ভালো মাঠ আছে। আমরা চাই জেলা লিগটা কোনো পর্যায়ে শুরু হোক। তবে মার্কেটিংয়ের প্রধান হিসেবে এ মুহূর্তে জেলা লিগের জন্য কেন্দ্রীয় স্পন্সর আনা সহজ নয়। আমাদের পরিকল্পনা আছে স্থানীয় স্পন্সরদের অনুরোধ করে লিগগুলো চালিয়ে নেওয়ার। সামনের বছর কেন্দ্রীয় স্পন্সর নিয়ে কাজ করব।
সত্তর-আশির দশকে ফুটবল অনেক তারকা ছিল। তারকাখ্যাতিও ছিল আকাশছোঁয়া। ফুটবল কর্তারা সেই খ্যাতি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। আপনারা একজন মহাতারকা পেয়েছেন। হামজা চৌধুরীর তারকাখ্যাতি কীভাবে কাজে লাগাবে বাফুফে?
ফাহাদ করিম : এটা সত্যি যে হামজা আসায় ফুটবলের ইমেজ সংকট অনেকটাই কেটেছে। একজন প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড় যখন জাতীয় দলে খেলে, তখন সামগ্রিকভাবেই ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। মার্কেটিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলছি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে হামজাকে যুক্ত করার কাজ করছি। এতে হয়তো বাফুফে আর্থিক লাভবান হবে না। তবে বাংলাদেশে হামজাকে যত বেশি দেখাতে পারব, ততই ফুটবল আলোচনায় থাকবে। ফুটবলের ব্র্যান্ডভ্যালু বাড়বে। ইতিমধ্যে ওর এজেন্টের সঙ্গে তিনটি প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছি। আমার বিশ্বাস অচিরেই কোনো ফুটবলারকে অনেক দিন পর বিজ্ঞাপন চিত্র ও বিলবোর্ডে দেখা যাবে।
হামজার কারণে শোনা যাচ্ছে আরও অনেক প্রবাসী আগ্রহ দেখাচ্ছে?
ফাহাদ করিম : সত্যি শুনেছেন। সভাপতি আমাকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেটা করতে গিয়ে ডেনমার্ক প্রবাসী একজন, যার নাম সাকিব, তার সঙ্গে কথা হয়। সেও অনেক দিন ধরে ছেলে ও মেয়ে প্রবাসী ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করছে। তার সহায়তায় এই ঈদের ছুটিতেই দুই-তিনজন ট্রায়াল দিতে আসবে। এছাড়া জুনের শেষ দিকে ৩০ জনের বেশি প্রবাসী ফুটবলারকে নিয়ে তিন থেকে পাঁচদিনের ট্রায়াল হবে টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের অধীনে। সেখান থেকে যাদের পছন্দ হবে, তাদের বিভিন্ন পর্যায়ে খেলানো হবে। সভাপতি চান প্রবাসীদের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে খেলাতে। যাতে সেখান থেকে তৈরি হয়ে তারা জাতীয় দলে আসে।
এটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে স্থানীয়রা এই প্রবাসীদের সহজভাবে নিতে পারে না। সেটা জামাল ভূঁইয়ার ক্ষেত্রেও হয়েছিল। এ ছাড়া ফাহমেদুল ইসলামের সুযোগ না পাওয়ার নেপথ্যেও শোনা যায় স্থানীয়দের ভূমিকা ছিল। স্থানীয় ও প্রবাসীদের ব্লেন্ডটা কীভাবে করবেন?
ফাহাদ করিম : এক্ষেত্রেও আমি হামজাকে ধন্যবাদ দেব। কারণ ওর মানের একজন ফুটবলার যখন খেলে, তখন বাকিদের মধ্যে তাড়না থাকে ওর কাছাকাছি মানে খেলার, নিজেদের উন্নত করার। আমার মনে হয়, কোয়ালিটি প্রবাসী ফুটবলারদের খুঁজে পেলে, অন্যদের মধ্যেও ভালো করার চেষ্টা ও তাড়না বাড়বে। ফাহমেদুলের ব্যাপারে কোচের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে। কোচ কিন্তু ওর ব্যাপারে খুব ইতিবাচক। বলেছেন, ওকে অনূর্ধ্ব-২৩ দলে লাগবে। তবে ওর যেহেতু বয়স কম, মেজাজ গরম করে ফেলে হুটহাট, তাই ওকে কিছুটা পরিণত হয়ে উঠতে হবে।
শেষ প্রশ্ন চার বছর পর বাফুফে ও ফুটবলকে কোথায় রেখে যেতে চান?
ফাহাদ করিম : আল্লাহ যদি আমাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করার তৌফিক দেন, তবে চেষ্টা করব ফুটবলে স্পন্সর নেই, টাকা নেই, এই দুর্নাম ঘোচানোর। খুব শক্তিশালী দুটি (নারী-পুরুষ) জাতীয় দল গড়তে চাই যাতে সাফের গ-ি ছাড়িয়ে এশিয়ার ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, লড়াই করতে পারে। এর সঙ্গে বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ নিয়মিত করে একটা শক্ত পাইপলাইন গড়ে তোলা হবে আমাদের লক্ষ্য। মোটা দাগে চাইব বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ভাবমূর্তি আকাশচুম্বী করতে।
