আধুনিক আয়ুর্বেদশাস্ত্রের পথিকৃৎ যোগেশচন্দ্র

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:৫৯ এএম

ইংরেজ আমলে এদেশের কৃতী সন্তানরা দেশকে স্বাধীন করার জন্য যেমন লড়াই করেছেন তেমনি দেশকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করে দেশ গড়তেও হয়েছিলেন সচেষ্ট। এই কৃতী সন্তানদের একজন যোগেশচন্দ্র ঘোষ। তিনিই প্রথম পূর্ববঙ্গে আয়ুর্বেদিক ওষুধের কারখানা স্থাপন করেন। ১৯৭১ সালের আজকের দিনে অর্থাৎ ৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে মৃত্যুবরণ করেন। লিখেছেন এজাজ পারভেজ

যোগেশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন বাংলার আরেক কৃতী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছাত্র। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় পাগল বিজ্ঞানী বা বিপ্লবী বিজ্ঞানী নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি যেমন ছিলেন রসায়নশাস্ত্রের সুপ-িত তেমনি ছিলেন স্বদেশপ্রেমে দিক্ষিত। বিশ^াস করতেন দেশ যদি অর্থনৈতিকভাবে সবল না হয়, যদি স্বনির্ভর না হয় তবে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও তা রক্ষা করা যাবে না। এই চিন্তা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যালস, যা ছিল অবিভক্ত ভারতের প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি এখনো বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস নামে মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বহালতবিয়তে টিকে আছে। এই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহে সাধনা ঔষধালয় প্রতিষ্ঠা করেন যোগেশচন্দ্র। আধুনিক রসায়নবিদ্যা ও এ অঞ্চলের যুগযুগান্তরের আয়ুর্বেদিকশাস্ত্রের সাধনার সমন্বয়ে ওষুধ আবিষ্কার ও উৎপাদন শুরু করেন। এ কারণে তাকে এ অঞ্চলের আধুনিক আয়ুর্বেদিকশাস্ত্রের জনক বলা হয়। 

যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৮৮৭ সালে শরীয়তপুরের গোসাইরহাটের জলছত্র গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯০২ সালে ঢাকার কেএল জুবিলী স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স (বর্তমান এসএসসি সমমান) পাস করেন। ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফএ (বর্তমান এইচএসসি সমমান) পাস করেন। বিজ্ঞানের ভালো ছাত্র যোগেশচন্দ্র এরপর কুচবিহার কলেজে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএ পাসের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে এমএ পাস করেন। এখানেই পরিচয় হয় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে। তার চিন্তা ও আদর্শে দারুণভাবে প্রভাবিত হন যোগেশচন্দ্র। শুধু রসায়নশাস্ত্রই নয়, তার কাছে দেশপ্রেম, মানবতা, কর্মনিষ্ঠা এবং সমাজসেবার দীক্ষা গ্রহণ করেন।

এমএ পাস করার পর তিনি ভাগলপুর কলেজে শিক্ষকতার চাকরি নেন। ১৯০৮ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত ভাগলপুর কলেজে অধ্যাপনা করেন। এরপর তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজে যোগ দেন। এখানেই তিনি প্রফুল্লচন্দ্রের মানবসেবাভিত্তিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ার নীতিকে বাস্তবে রূপ দেন। ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সাধনা ঔষধালয়। সঙ্গে চলতে থাকে গবেষণা। তার গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রাচীন আয়ুর্বেদিকশাস্ত্রের সম্মিলিত গুণসম্পন্ন ওষুধ আবিষ্কার। তিনি শুধু বিভিন্ন রোগের ওষুধ আবিষ্কার ও উৎপাদনই করেননি। বরং সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করেছেন বই লিখে। তিনি বিভিন্ন রোগের কারণ ও লক্ষণ, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার তত্ত্ব এবং এর ব্যবহার পদ্ধতি নিয়ে যে বইগুলো লিখেছেন তার মধ্যে অগ্নিমান্দ্য ও কোষ্ঠাবদ্ধতা, আরোগ্যের পথ, গৃহ-চিকিৎসা, চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্য বিধি, চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা ও মুখরোগ চিকিৎসা, আমরা কোন পথে, আয়ুর্বেদ ইতিহাস প্রভৃতি অন্যতম।

ব্যবসায়ে যুক্ত হলেও তার শিক্ষকতা পেশায় যেমন ছেদ পড়েনি তেমনি ছেদ পড়েনি গবেষণায়। এর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লন্ডন কেমিক্যাল সোসাইটির ফেলো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেমিক্যাল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করে পুরোপুরি ব্যবসা ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।

সে সময় ভারতবর্ষের আয়ুর্বেদী ওষুধের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ছিল সাধনা ঔষধালয়। কলকাতা ও এর কাছাকাছি এলাকায় পাঁচটি কারখানা ছিল এই প্রতিষ্ঠানের। বিহার ও আসামেও সাধনার ওষুধের চাহিদা ছিল।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলেও যোগেশচন্দ্র নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাননি। ৪ এপ্রিল তিনি যখন কারখানায় কাজ করছিলেন তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কারখানা আক্রমণ করে এবং তাদের হাতে তিনি মারা যান। জ্ঞানসাধক ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত মানুষের জন্য তিনি এক অজর অনুপ্রেরণা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত