১০ দিনের মধ্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:২৬ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নিজেদের সাংগঠনিক কাজ গুছিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে দলটি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি ঘোষণার কার্যক্রম শুরু করবে বলে এনসিপি সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে মিটিং-আলোচনা ও মতামত গ্রহণের মাধ্যমে দলীয় কাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। দলীয় নিবন্ধনের লক্ষ্য সামনে রেখে ধাপে ধাপে রাজনৈতিক কর্মকৌশল সাজাচ্ছে দলটি। আগামী ডিসেম্বর বা জুনে সংসদ নির্বাচনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে এক বছর বা তারও বেশি সময় পাচ্ছে দলটি। নির্বাচনে দলের ম্যান্ডেট কী হবে, দল কি এককভাবে না জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে এসব নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। তবে আপাতত নিবন্ধন পেতেই বেশি চিন্তিত দলটির নেতারা।

দলটি ইতিমধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজারে শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে কর্মসূচি শুরু করেছে। তাছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যান শহীদ পরিবার ও ইন্টারকন্টিনেন্টালে রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতার মাহফিল, ফিলিস্তিন ও ভারত ইস্যুতে বিক্ষোভসহ নানা সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করেছে।

এর আগে এনসিপির শীর্ষ নেতারা বলেছিলেন, জাতীয় নাগরিক কমিটিকেই নাগরিক পার্টিতে রূপান্তর করা হতে পারে। জাতীয় নাগরিক কমিটির ৪৩০-এর অধিক জেলা-উপজেলা কমিটি রয়েছে। কমিটিগুলো এনসিপির কমিটি হিসেবেই কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। তবে এ বিষয়ে দ্বিমত করছেন অনেকেই। তাদের মতে জাতীয় নাগরিক কমিটিতে সবাই রাজনীতি করার জন্য যুক্ত হয়নি। তবে যারা এখন রাজনীতি করতে ইচ্ছুক তাদের এনসিপির কমিটিতে রাখা হতে পারে। তবে মূল কমিটিতে দল-মত নির্বিশেষে যারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তাদের রাখা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, জাতীয় নাগরিক কমিটির কমিটিকেই এনসিপিতে রূপান্তর করা হবে, এমন না। এখানে যারা রাজনীতি করতে ইচ্ছুক সেটা নাগরিক কমিটি হোক, বৈষম্যবিরোধী অথবা অন্যান্য সংগঠনের যে কেউ এনসিপিতে যুক্ত হতে চাইলে তাকেও কমিটিতে রাখা হবে।

নিবন্ধনের যত শর্ত : কোনো দল দলীয় প্রতীকে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইলে প্রথমে নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করতে হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৯০ ‘ক’ ধারা অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেতে চাইলে তিনটি শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করতে হবে : ১. স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত কোনো সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে কমপক্ষে একটি আসনে বিজয়। ২. সেসব নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা যেসব আসনে অংশ নিয়েছেন, সেসব আসনে মোট ভোটের ৫ শতাংশ অর্জন। ৩. কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় অফিস থাকতে হবে। দেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জেলায় জেলা অফিস থাকতে হবে। আর অন্তত ১০০টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন এলাকার থানায় অফিস থাকতে হবে, যার প্রতিটিতে সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ২০০ জন ভোটার থাকবে।

এসব ছাড়াও নিবন্ধন পেতে আগ্রহী দলটির গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা; কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখা (২০৩০ সালের মধ্যে পূরণ) এসবসহ আরও কিছু বিধান রাখার শর্ত রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিকে নিবন্ধন পেতে এসব শর্ত পূরণ করতে হবে।

তবে অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠিত ‘নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’ নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য কিছু শর্ত শিথিলের প্রস্তাব করেছে। তাদের প্রস্তাব হলো, নিবন্ধন পেতে ১০ শতাংশ জেলা ও ৫ শতাংশ উপজেলা বা থানায় দলের অফিস এবং দলটির কমপক্ষে পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে হবে।

নিজ নিজ এলাকায় চলছে প্রচারণা : এনসিপি সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে দলটির শীর্ষ নেতারা নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় ভোটের প্রচারণা শুরু করেছেন। অধিকাংশ নেতাই নিজ এলাকায় দৌড়ঝাঁপ করছেন। সব আসনেই এনসিপি যোগ্য প্রার্থী দিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে চায়। দলের নেতারা নিজ নিজ সংসদীয় আসন এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারলে নির্বাচনে জোট করতে হলে আসন নিয়ে হিসেব-নিকেশ সহজ হবে। তাই আসনভিত্তিক নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে কাজ করছেন নেতারা।

এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা খুব দ্রুত দলের কাঠামো গঠনে মনোযোগ দেব। আগামী সপ্তাহে আমাদের কাজ শুরু হয়ে যাবে। এখন আমাদের কমিটি দেওয়া হয়নি, তবে আলোচনা চলমান রয়েছে। শিগগিরই তা বাস্তবায়ন করা হবে।

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব/উপ-দপ্তর সম্পাদক সালেহ উদ্দিন সিফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে এনসিপি তার গঠনতন্ত্র নিয়ে কাজ করছে। দল নিবন্ধনের যে প্রক্রিয়া তা পূর্ণ করার চেষ্টা করছি। যেখানে যেখানে সাংগঠনিক বিস্তার প্রয়োজন সে অনুযায়ী কমিটি ঘোষণা করা হবে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তি এমনকি যদি অন্যান্য ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল থেকেও কেউ এনসিপিতে এসে রাজনীতি করতে চাইলে তাদের সমন্বয় করে কমিটি ঘোষণা করা হবে। তবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও নাগরিক কমিটির জেলা কমিটিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেই তা করা হবে।

যুগ্ম সদস্য সচিব মিরাজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তিনটি বিষয় সামনে নিয়ে এগোচ্ছি। প্রথমত দলের নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে আমাদের এখন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং অর্থসংক্রান্ত নীতি তৈরি হচ্ছে। এটা হয়ে গেলে জেনারেল মিটিং এ পাস করা হবে। এরপর আমরা একটি ওয়েবসাইট তৈরি করছি, যার কাজ প্রায় শেষের দিকে আছে। এরপর আমরা জেলা ও থানাগুলোতে অনলাইন ও অফলাইন সদস্য ফর্ম ছাড়ব। এর মাধ্যমে আমরা এনসিপির সদস্য সংগ্রহ করে কমিটি দেওয়ার কাজ এগিয়ে নেব।’

তিনি বলেন, আমাদের দলের গঠনতন্ত্রের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। পাশাপাশি আগামী সপ্তাহ থেকেই দলের বিস্তারে পুরোদমে কাজ শুরু হবে। জেলা বা উপজেলা কমিটিগুলোও দলের সদস্য সংগ্রহের পরই করা হবে। আমাদের আলোচনা হচ্ছে আমাদের কি থানা কমিটি হবে না-কি জেলা পর্যায়ে কমিটি হবে। এটা নির্ধারণ হলে নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধীর কমিটিগুলোতে যারা লং টার্মে রাজনীতি করতে ইচ্ছুক তারা ফর্ম পূরণ করে এনসিপির সদস্য হবে। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত যারা ফর্ম পূরণ করে সদস্য হবে তাদের সমন্বয় করে আহ্বায়ক, সদস্য সচিবসহ ছোট করে কমিটি গঠন করে দেওয়া হতে পারে। পরে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হবে। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে, এখনো কিছু নিশ্চিত হয়নি। এভাবেই আমরা দলীয় নিবন্ধনের দিকে অগ্রসর হব বলে জানান মিরাজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত