পহেলা বৈশাখ হবে সার্বজনীন, থাকবে ভিন্নধর্মী আয়োজন

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:২৯ এএম

আগমনী বার্তার জানান দিচ্ছে বাংলা নববর্ষ। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মধ্য দিয়ে বরণ করা হবে নতুন বাংলা বছর ১৪৩২। এবারের পহেলা বৈশাখ হবে সার্বজনীন। থাকছে বেশ কিছু নতুন মাত্রা। নববর্ষের শোভাযাত্রায় বাঙালি ছাড়াও ২৭ জাতিগোষ্ঠী অংশগ্রহণ করবে। শোভাযাত্রায় কৃষক একটি বড় থিম হিসেবে থাকবে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে শান্তির বার্তা। পুরো আয়োজন ঘিরে থাকবে কঠোর নিরাপত্তা।

বিকেলে কনসার্ট, ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদে গান আর রাতে অনুষ্ঠিত হবে ড্রোন শো। সঙ্গে আরও নানান দেশীয় আয়োজন। এবার নববর্ষের অনুষ্ঠান সন্ধ্যার মধ্যেই শেষ করার কোনো বিধিনিষেধ থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি নিয়ে সন্ধ্যার পরও অনুষ্ঠান চলমান রাখা যাবে। নববর্ষের আগের দিন চৈত্রসংক্রান্তি। এ উৎসব ঘিরে এবার প্রথম সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে ১৬ বছর পর মুক্ত পরিবেশে এবারের পহেলা বৈশাখ পালন করবে বিএনপি। এজন্য বড় পরিসরে দিনটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। ওইদিন বৈশাখী যাত্রা/র‌্যালি থেকে শুরু করে মেলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। সারা দেশের মহানগর, জেলা ও উপজেলায় এ কর্মসূচি পালিত হবে।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, বাংলা নববর্ষে চারুকলার শোভাযাত্রায় বাঙালি ছাড়াও ২৭টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অংশগ্রহণ করে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরবে। ওইদিন বিকেলে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া চীনা দূতাবাসের অর্থায়নে বিকেলে ড্রোন শো হবে। যেখানে ২৪-এর জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আয়োজন থাকবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কনসার্ট হবে চৈত্রসংক্রান্তির সন্ধ্যায়।

পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিন নিয়ে গান গাওয়া হবে উল্লেখ করে উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ২০০ গিটারিস্ট নিয়ে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদে গান পরিবেশন করবে রকস্টার ব্যান্ড বামবা। পাশাপাশি ফিলিস্তিনি পতাকা ও তাদের প্রতি সমর্থনমূলক গান পরিবেশিত হবে। ঢাকার আশপাশে যত মিউজিশিয়ান আছেন, যারা গিটার বাজাতে পারেন, তাদের অনুরোধ করব আপনারা গিটারটা নিয়ে র‌্যালিতে চলে আসেন এবং সঙ্গে ফিলিস্তিনের একটা পতাকা রাখবেন।

শোভাযাত্রার বড় অংশ জুড়ে বাংলার লোকসংস্কৃতি ফুটিয়ে তোলা হবে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘নববর্ষের শোভাযাত্রা মধ্যবিত্তদের চালু করা। তবে এর সঙ্গে ফসল সম্পর্কিত ছিল। যেকোনোভাবে হোক আমাদের শোভাযাত্রায় এগুলো স্থান পায়নি। নববর্ষের এবারের শোভাযাত্রার থিম হবে কৃষক, যা বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের প্রতি সম্মান জানাতে চিহ্নিত করা হবে। এটি কৃষকের অবদান ও তাদের সংগ্রামকে স্বীকৃতি প্রদান করবে।

সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা এ বিষয়ে আরও বলেন, এটি আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির অংশ হিসেবে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসবে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছাবে। এবারের বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রা আগের সববারের চেয়ে ভিন্ন হতে যাচ্ছে। এসব আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি করা এবং একতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভাজনের রাজনীতির কারণে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভেতরে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কালচারাল হিলিং ও কালচারাল ইনক্লুসিভনেসের মাধ্যমে তা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ঈদ উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার ভিডিও বার্তায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা মেহমানের প্রতি শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টি উল্লেখ করে ফারুকী বলেন, ‘ঈদের সময় প্রধান উপদেষ্টা একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। সেখানে আলাদা বিষয় হচ্ছে, তিনি দেশের যে মেহমান ১২ লাখ রোহিঙ্গা তাদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এর অর্থ দাঁড়ায় এই ১২ লাখ মেহমান নিজ দেশে ঈদ করার জন্য অপেক্ষায় আছে। আমি মনে করি এটাই হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি। আপনি কী বা আপনি অন্যের জন্য কী মনে করেন, এটা কিন্তু বলে দেয় আপনার সংস্কৃতিটা কী। এই যে আমরা ১২ লাখ রোহিঙ্গার কথা মনে করছি, এটাই বলে দেয় আমাদের সংস্কৃতি কী।’

তিনি আরও বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। তবে বিরক্তিকর ভুভুজেলামুক্ত শোভাযাত্রা করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ থাকবে নাকি অন্য কোনো নামকরণ হবে, তা আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে জানাবে বলে জানান সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা।

নববর্ষ দিনের অন্যান্য অনুষ্ঠান সম্পর্কে সংস্কৃতি উপদেষ্টা জানান, প্রতিবারের মতো এবারও ছায়ানটের অনুষ্ঠান হচ্ছে। তবে স্থান বদলে সুরের ধারার অনুষ্ঠানটি এবার রবীন্দ্র সরোবরে হবে।

সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সুরের ধারা এবার বাংলা গানের বাইরেও ভিন্ন আয়োজন রাখবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজন করা হবে বৈশাখী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেন, আসন্ন বাংলা নববর্ষ এবং পাহাড় ও সমতলের জাতিগোষ্ঠীদের বর্ষবরণ উৎসব উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সাজসাজ রব।

এদিকে গত সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া বাংলা সংস্কৃতির অংশ নয়। যারা ইলিশ কিনে খাবেন তারা আইনের লঙ্ঘন করবেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে আরোপিত সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। পান্তা ভাতের সঙ্গে ভর্তা, মরিচ বা অন্য মাছ খেলে তো অসুবিধা নেই।

এর আগে উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছিলেন, ‘এবার পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রা বের হবে ভিন্ন আঙ্গিকে। আগে সবাইকে নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা হতো না। আগে শোভাযাত্রা ছিল শুধু বাঙালিদের শোভাযাত্রা, এবার সব জাতিগোষ্ঠীর শোভাযাত্রা হবে এটি।’

সব মাদ্রাসায় বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নির্দেশ : চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ এবং আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উপলক্ষে সব মাদ্রাসায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনা উৎসবমুখর পরিবেশে ও সাড়ম্বরে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করার কথা জানিয়ে গতকাল নির্দেশনা জারি করেছে শিক্ষা অধিদপ্তর।

ওই আদেশ তিনটি সরকারি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও সব বেসরকারি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, সুপার ও এবতেদায়ি প্রধানদের পাঠিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর।

এর আগে গত ২৩ মার্চ সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ইতিমধ্যে সব স্কুল-কলেজে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিবসটি উদযাপন করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নির্দেশনা দিয়েছে।

পহেলা বৈশাখে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা : বাংলা নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা মহানগর এলাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে গতকাল সমন্বয় সভার আয়োজন করা হয়। এতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করা হবে। পহেলা বৈশাখ আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে ও নিরাপদে উদযাপনের জন্য ডিএমপি কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেবে।

ডিএমপি কমিশনারের সভাপতিত্বে সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি, পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটের প্রতিনিধি, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, ডিপিডিসি, ওয়াসা, গণপূর্ত, বাংলা একাডেমি, ঢাবির চারুকলা অনুষদ, টিএসসির সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ছায়ানট, ঋষিজ শিল্পগোষ্ঠী, শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার, সরকারি-বেসরকারি সেবাদানকারী সংস্থার প্রতিনিধি এবং পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত