উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গত ১৩ এপ্রিল, রবিবার জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বৈঠক করেছেন। খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন তার বড় ছেলে এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপির সূত্র বলছে, বৈঠকটি রাজনৈতিক কোনো প্রেক্ষাপটে ছিল কি না তা জানা যায়নি। তবে সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান ফেসবুকে এই সাক্ষাৎ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, ‘এ বৈঠক রাজনীতির রসায়নে নতুন কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হবে।’ জামায়াতের আমির মঙ্গলবার রাতে একটি জাতীয় দৈনিকে বলেন, ‘বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমরা একসঙ্গে অনেক দিন কাজ করেছি। উনি অসুস্থ। ওনার খোঁজখবর নেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বহুদিন পর আমাদের দেখা হয়েছে। আমরা ওনার জন্য দোয়া করেছি, ওনার কাছে দোয়া চেয়েছি।’ তারেক রহমানের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, ‘দুজন মানুষ একসঙ্গে হলে তো অনেক কথাই হয়। অনেক কথাই হয়েছে।’ তবে তিনি এর বেশি কিছু বলতে চাননি।
তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের অঘোষিত বৈঠক রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও, বিভিন্ন সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, এটি নতুন একটি রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত দিতে পারে। বৈঠকটি শুধু সৌজন্য নয়, বরং নানা প্রশ্ন, কৌতূহল ও বিতর্ক উসকে দিয়েছে। একদিকে বিএনপি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছে, অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা অনেকের চোখে দ্বৈততা ও আদর্শগত আপস। একাংশের মতে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বৃহত্তর ঐক্য গঠন জরুরি, যেখানে কাউকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া কঠিন। তাদের যুক্তি, ভোটাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বাস্তববাদী কৌশল দরকার। এই ভিন্নমতের মধ্যেই স্পষ্ট হয় রাজনীতি শুধু কৌশল নয়; তা আদর্শ, ইতিহাস ও জনচেতনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই রাজনৈতিক সমঝোতা শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং নৈতিক বৈধতা ও জনসমর্থনের ভিত্তিতেই টিকতে পারে।
বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নতুন নয় জোট-রাজনীতি, আন্দোলন ও ক্ষমতা ভাগাভাগির ইতিহাস তাদের বাস্তবধর্মী সম্পর্ককে স্পষ্ট করে। তবে গত এক দশকে যুদ্ধাপরাধের বিচার, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে এই সম্পর্ক সংকটপূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াত আমিরের হঠাৎ বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকে কেবল সৌজন্য নয়, বরং একটি কৌশলগত সমন্বয়ের প্রচেষ্টা বলেই দেখা হচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের যে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, সেখানে এই বৈঠক একটি কৌশলগত আলোচনা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিও একটি বার্তা বহন করতে পারে। বিএনপি-জামায়াত যদি সহনশীল রাজনৈতিক আচরণের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে পশ্চিমা দাতাগোষ্ঠী ও কূটনীতিকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। তবে জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পর্ক নবীন প্রজন্ম, মধ্যবিত্ত ও আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জামায়াতের রাজনৈতিক ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিপরীত। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অনেক নেতা দণ্ডিত হলেও দলটি আজও সে অপরাধ অস্বীকার করে, ক্ষমা চায়নি। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায় অস্বীকার করে যারা, তারা কীভাবে গণতান্ত্রিক সমাজে বিশ্বাসযোগ্যতা দাবি করতে পারে? এটাই মূল প্রশ্ন। ধর্ম মানুষের নৈতিক ও আত্মিক উন্নতির পথ, কিন্তু জামায়াত একে করেছে রাজনৈতিক স্বার্থের ঢাল। তারা ইসলামের সাম্য, সহনশীলতা ও মানবতার বাণী নয়, বরং শাসনক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতার সঙ্গেও জামায়াতের নাম জড়িত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় এবং ২০১৩-২০১৫ সালের সহিংস আন্দোলনে তারা হরতাল, বোমা হামলা, সরকারি স্থাপনায় আগুন, পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই সহিংস কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জামায়াতের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সহিংস রাজনীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যেখানে জনগণ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের দাবিতে রাজপথে নামে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী কৌশলগতভাবে এই সুযোগকে দুর্বল করতে অপপ্রচারে নামে। তারা যুদ্ধাপরাধ ও নিজেদের নৈতিক সংকট আড়াল করতে বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নতুন করে উসকে দেয়। লক্ষ্য ছিল, বিএনপিকে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারক হিসেবে চিহ্নিত করে তরুণদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। সাংগঠনিক ও মিডিয়া ব্যবহার করে জামায়াত বিএনপিকে দুর্নীতিবাজ, ফ্যাসিবাদী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এভাবে তারা রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করে নিজেদের ‘কৌশলগত মিত্র’ হিসেবে পুনঃস্থাপনের চেষ্টা চালায়। এটি ছিল নীরব রাজনৈতিক ছিনতাই।
জামায়াতের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং ১৯৮৬ সালে এরশাদের নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে ধ্বংস করেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে কখনো জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়ায় তাদের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। বিএনপি বিশ্বাস করে, গণতন্ত্রের মূল শক্তি নির্বাচন। অতীতের সহিংস রাজনীতির শিক্ষা নিয়ে তারা শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে আগ্রহী। সব মত, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শন গড়তে চায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘সবার বাংলাদেশ’ গড়ার যে দর্শন- তা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে। এটি গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক, যা বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা ও ভিশন-২০৩০-এ প্রতিফলিত।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংগঠনিক সম্পাদক, ডিইউজে
