চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) দুই শতাধিক প্রকল্প রাখা হয়েছে সমাপ্য প্রকল্পের তালিকায়। এর মধ্যে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ছয়টি প্রকল্প রয়েছে। তবে এই ছয়টি প্রকল্পের মধ্যে চারটি প্রকল্প সময়মতো শেষ করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে ক্রীড়া পরিষদ। এ প্রকল্পগুলো আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে ক্রীড়া পরিষদ। পরে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, চারটি প্রকল্প সময়মতো শেষ করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে ক্রীড়া পরিষদ। এ প্রকল্পগুলো হলো বরিশাল কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ এবং বিদ্যমান জেলা সুইমিং পুলের উন্নয়ন, চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়াম ও সুইমিং পুলের অধিকতর উন্নয়নসহ ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং শরীয়তপুর জেলা সদরে ইনডোর স্টেডিয়াম ও টেনিস কোর্ট নির্মাণ, গাজীপুরের শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়াম এবং পটুয়াখালী জেলার কাজী আবুল কাশেম স্টেডিয়ামের অধিকতর উন্নয়ন এবং মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা ও ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামের অধিকতর উন্নয়ন এবং গাজীপুর জেলা সদরে সুইমিং পুল নির্মাণ প্রকল্প।
৬৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন বরিশাল কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ এবং বিদ্যমান জেলা সুইমিং পুলের উন্নয়ন প্রকল্পটি সময়মতো শেষ না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়ে, গত বছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্মাণকাজ বাস্তবায়নে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়া, মাঠের গ্রাউন্ড সরঞ্জাম সরবরাহ কাজের দরপত্রে কোনো ঠিকাদার অংশগ্রহণ না করা, গ্যালারিতে চেয়ার স্থাপন কাজের নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হলেও চেয়ার সরবরাহ ও স্থাপন কাজে অধিক সময় প্রয়োজন হওয়া এবং প্যাভিলিয়ন ভবন ও মিডিয়া সেন্টারে লিফট বিদেশ থেকে আমদানি করা এবং স্থাপনে অধিক সময় প্রয়োজন হওয়া।
৪৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়াম ও সুইমিং পুলের অধিকতর উন্নয়নসহ ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং শরীয়তপুর জেলা সদরে ইনডোর স্টেডিয়াম ও টেনিস কোর্ট নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হতে দেরি হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তারুণ্যের উৎসবের অংশ হিসেবে মেলা আয়োজন করায় প্রায় দুই মাস জেলা স্টেডিয়ামে কোনো কাজ করা সম্ভব হয়নি এবং জুলাই-আগস্ট মাসে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
৪৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন গাজীপুরের শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়াম এবং পটুয়াখালী জেলার কাজী আবুল কাশেম স্টেডিয়ামের অধিকতর উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পটি সময়মতো শেষ না হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে গত বছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্মাণকাজ বাস্তবায়নে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া গাজীপুরের টঙ্গীতে টেলিফোন শিল্প সংস্থার সঙ্গে জমির মালিকানার বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে তারা চিঠি দিয়ে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামের কাজ বন্ধ করে দেয়।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা ও ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামের অধিকতর উন্নয়ন এবং গাজীপুর জেলা সদরে সুইমিং পুল নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়ন করতে না পারার বিষয়ে চিঠিতে জানানো হয়, জুলাই-আগস্ট সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্মাণকাজ বাস্তবায়নে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়া, নতুন অঙ্গ সংযোজন করা এবং গাজীপুরে নির্মাণাধীন সুইমিং পুলের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকাজে স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তিতে দেরি হওয়া।
জানতে চাইলে ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নানা কারণে চিঠিতে উল্লিখিত প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এগুলোর বাস্তবায়ন শেষ করতে আরও ছয় মাস সময় চাওয়া হয়েছে। তবে মেয়াদ বৃদ্ধি হলেও প্রকল্পগুলো ব্যয় বাড়বে না। ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
জানা যায়, দেশের বেশিরভাগ উন্নয়ন প্রকল্পই নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয় না। তিন বছর মেয়াদ থাকলেও কোনো প্রকল্পে লাগে পাঁচ বছর, কোনোটায় সাত বছর, আবার কোনোটায় ১০ বছর। ১৫ বছর ধরে চলছে এমন প্রকল্পও আছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ধীর গতির পেছনে গত বছর ২৮টি কারণ খুঁজে পায় পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটি বলেছে, প্রকল্প তৈরি অনুমোদন পর্যায়ে ১১টি, বাস্তবায়ন পর্যায়ে ১১টি এবং প্রকল্পের শেষে ছয়টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের কাক্সিক্ষত বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে প্রকল্পের কাজ। বাড়ছে মেয়াদ ও ব্যয়। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রকল্প তৈরিতে দুর্বলতা, দক্ষতার অভাবে অন্য প্রকল্পের ছক অনুসরণ করে নতুন প্রকল্প তৈরি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রকল্প প্রস্তাবে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা লক্ষ্য অর্জনের তথ্যে অপর্যাপ্ততা এবং প্রকল্প গ্রহণে সুবিধাভোগীদের মতামত না নেওয়া। এ ছাড়া প্রকল্প তৈরির সময় রেজাল্ট ফ্রেমওয়ার্ক ও লগ ফ্রেমওয়ার্ক ঠিকভাবে না করা, প্রকল্প নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ভূমি চিহ্নিত না করা, এমটিবিএফের আর্থিক সীমা অনুসরণ না করা এবং প্রকল্পের ফলাফল টেকসই করতে পরিকল্পনা সঠিকভাবে তৈরি না করা, প্রকল্প প্রস্তাবে দেওয়া কর্মপরিকল্পনা ও ক্রয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করা, প্রকল্পের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা এবং তা পরিবীক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এবং মাঠপর্যায়ে প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি।