ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে অভিবাসী আইন যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠোর করেন। তার এ সিদ্ধান্তে দুঃস্বপ্ন নেমে আসে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রিত কিংবা আশ্রয়ের আবেদনকারীদের মধ্যে। এমনকি ট্রাম্পের এ খড়গ থেকে বাদ পড়েননি শিক্ষার্থীরাও। ইতিমধ্যে অনেক শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তেমনই এক শিক্ষার্থী বাংলাদেশের অঞ্জন রায়। এক ইমেইলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, দেশটিতে অবস্থান করে পড়ালেখা করার বৈধতা হারিয়েছেন তিনি। তবে আশাহত না হয়ে রুখে দাঁড়ান। গতকাল বুধবার এপির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার সেই লড়াইয়ের গল্প।
২৩ বছর বয়সী এ বাংলাদেশি গত বছর আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য মিসৌরির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে পড়ালেখা শুরু করেন। ডিসেম্বরে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর তিনি জানুয়ারিতে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু করেন। ২০২৬ সালের মে মাসে তার মাস্টার্স শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। গত ১০ এপ্রিল ইমেইলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে পড়াশোনা করার বৈধতা হারিয়েছেন। যার ফলে যেকোনো সময় তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে এমন আশঙ্কায় পড়েন। এপিকে তিনি বলেন, ‘আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। ভাবতে থাকি, এটা কীভাবে সম্ভব? ইমেইল পাওয়ার পর আমি এক সহপাঠীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেবা কার্যালয়ে যাই। সেখান থেকে ডেটাবেজ যাচাই করলে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে আমার বৈধতা বাতিল করার কারণ তারা জানেন না। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও একটি ইমেইল পাই। যেখানে বলা হয়, আমার ভিসা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং যেকোনো সময় আটক করা হতে পারে। দূতাবাস সতর্ক করে, আমাকে বাংলাদেশে ফেরত না পাঠিয়ে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠিয়ে দিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলেও পরে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার মনস্থির করি। নিজ বাড়িতে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ভেবে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যাই। ক্লাসে যাওয়া বন্ধ রাখি। ইন্টারনেটও ব্যবহার করিনি।’
তিনি আরও জানান, শিক্ষকরা তার প্রতি সহানুভূতিশীল থাকায় ক্লাসে না আসার বিষয়টি বুঝতে পারেন। তবে এ সপ্তাহে আদালতের রায়ে নিজের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের বৈধতা ফিরে পেয়েছেন। ফিরেছেন নিজের অ্যাপার্টমেন্টে। তারপরও অজানা আশঙ্কায় রুমমেটদের অনুরোধ করেছেন, কেউ তার খোঁজ করতে আসে কি না, সেদিকে লক্ষ রাখতে।
অঞ্জন রায়ের মতো হাজারো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সম্প্রতি একই ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। তাদের শিক্ষাজীবন, ক্যারিয়ার ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের যাপিত জীবন সংশয়ের চাদরে ঢেকে দিয়েছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের দমনপীড়ন অভিযান। অনেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে সাফল্যের মুখ দেখেছেন। দেশ জুড়ে ফেডারেল বিচারকরা বিশেষ নির্দেশ দিয়ে আপাতত শিক্ষার্থীদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত করছেন। সাময়িক হলেও এ উদ্যোগে স্বস্তি ফিরে এসেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। আটলান্টায় ট্রাম্প প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা মামলায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অঞ্জনসহ ১৩৩ জন বাদী রয়েছেন। বিচারকরা তাদের পক্ষে রায় দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেছেন। একই ধরনের রায় এসেছে নিউ হ্যাম্পশায়ার, উইসকনসিন, মন্টানা, ওরেগন ও ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যেও। তবে কয়েকটি মামলায় বিচারকরা মত দিয়েছেন, সাময়িকভাবে বৈধতা হারালেও এতে শিক্ষার্থীদের কোনো অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে না। যার ফলে তারা সরকারি নির্দেশে স্থিতাবস্থা জারি করেননি।
গত মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, যেসব বিদেশি নাগরিক দেশের স্বার্থবিরোধী কাজে নিয়োজিত, তাদের ভিসা বাতিল করা হবে। তাদের মধ্যে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসরায়েলি গণহত্যাবিরোধী ও ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীরাও অন্তর্ভুক্ত। তিনি জানান, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগও আনা হবে। তবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অঞ্জন ও অন্যান্য বাদীপক্ষের আইনজীবী চার্লস কাক যুক্তি দেন, শিক্ষার্থীদের ভিসা বা বৈধতা বাতিলের কোনো এখতিয়ার সরকারের নেই। তিনি গত সপ্তাহে আদালতে দাবি করেন, সরকার ভয়ভীতি দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে চাইছে।
তিনি মন্তব্য করেন, শিক্ষার্থীদের ওপর অবর্ণনীয় মানসিক চাপ দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আর ডেভিড পাওয়েল যুক্তি দেন, বৈধতা হারালেও ওই শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি হয়নি। কারণ, তারা সহজেই অ্যাকাডেমিক ক্রেডিট অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করতে পারবেন কিংবা অন্য কোনো দেশে চাকরি খুঁজতে পারবেন। মার্চ থেকে শুরু করে অন্তত ১৭৪ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী ভিসা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বৈধতা হারিয়েছেন।
