ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই সম্পন্ন করতে সর্বদলীয় ঐক্য ও জনমত গঠন করতে চায় বিএনপি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের ভিত্তিতে এই লক্ষ্যে দলটি ডান-বাম-ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিএনপি অন্তত সাতটি দল ও জোটের সঙ্গে ইতিমধ্যে বৈঠক সেরেছে।
এসব বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের ঐক্য গড়ে তুলতে চায় বিএনপি।’
তথ্য বলছে, ১৯ এপ্রিল ১২ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু করে দলটি। ওই দিনই এলডিপির সঙ্গেও আলাদা বৈঠক হয়। এতে বিএনপির নেতৃত্ব দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান। বিএনপি নেতারা ২০ এপ্রিল চা-চক্রে অংশ নেন সিপিবি, বাসদসহ বামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে। ওই দিনই গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গেও বৈঠক করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল। ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় লেবার পার্টির নেতাদের সঙ্গে, পরে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সঙ্গে বৈঠক করেন নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান। গত বুধবার বিকেলে এনডিএম ও গণফোরামের সঙ্গে, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ জন অধিকার পার্টি, ওই দিনই পরে বাম গণতান্ত্রিক ঐক্যের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতারা। এ ছাড়া গত মঙ্গলবার ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপি অনানুষ্ঠানিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে করেছে।
বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে আরও জানা গেছে, তারা সব রাজনৈতিক শক্তিকে এক ছাতার নিচে এনে সরকারের ওপর যৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করতে চান। বিএনপি দীর্ঘদিন পর সিপিবি-বাসদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেছে। ওই চা-চক্র থেকে আশাব্যঞ্জক সাড়াও মিলেছে। ফলে বামধারার সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার সম্ভাবনা আরও জোরদার হয়েছে। বিএনপি মনে করছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের বক্তব্যে এখনো স্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ না থাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সরকারের অবস্থান ও লক্ষ্য প্রশ্নে আস্থার ঘাটতি বাড়ছে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সরাসরি সরকারের বিরোধিতা নয়, বরং একযোগে সব দলের সমন্বয়ে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। এ প্রেক্ষাপটে গত ১৬ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রধান উপদেষ্টার হাতে দেওয়া চিঠিতে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়। যদিও প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে একটি সর্বোত্তম নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির কথা আবারও বলা হয়েছে।
২১ এপ্রিল বিএনপির সঙ্গে বৈঠক সম্পর্কে লেবার পার্টির সভাপতি ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বলছে নির্বাচন হবে, কিন্তু কী নির্বাচন হবে সেটি তারা বলেনি। সংসদ নির্বাচন, না গণপরিষদ নির্বাচন। এই বিভ্রান্তিই চলমান।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন আয়োজনের আগের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম যেমন ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি বা রোডম্যাপ প্রণয়ন কোনোটাই দেখা যাচ্ছে না। এতে মনে হচ্ছে না সরকার নির্বাচন নিয়ে আন্তরিক।’
১২ দলীয় জোটের এক নেতা জানান, ‘বিএনপি চায়, সব দলকে সঙ্গে নিয়ে একটি সম্মিলিত মত গঠন করে তা সরকারের উদ্দেশে জানাতে। বিএনপি শুধু একতরফা আন্দোলনের পক্ষপাতী নয়, তারা চাইছে সম্মিলিত অবস্থান।’
ওই নেতার মতে, ডিসেম্বরের পর দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৃষ্টিবাদল ও রোজা, এরপর কোরবানির ঈদ, সব মিলিয়ে নির্বাচন আয়োজন কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচন পেছানোর চিন্তা একটি বিরাজনীতিকরণ চক্রান্ত। গণতন্ত্রে প্রবেশের ফটক হচ্ছে নির্বাচন। ডিসেম্বরেই সেই ফটক খোলা দরকার।
যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপি অনানুষ্ঠানিক রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয় গত মঙ্গলবার। সেখানে জানানো হয়, বিএনপি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আগামী জাতীয় নির্বাচন চায়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করা হলে নির্বাচন ডিসেম্বরে না হয়ে আগামী জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতে হলেও তেমন আপত্তি থাকবে না দলটির। বিএনপি মনে করে, এর মধ্য দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সব ধরনের শঙ্কা যেমন কেটে যাবে, দেশও নির্বাচনের দিকে যাত্রা শুরু করবে। রাজনৈতিক দলগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করে দিতে পারবে।
এদিকে নির্বাচন নিয়ে ধর্মশ্রয়ী দলগুলো অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামি, ইসলামী আন্দোলন ইত্যাদির সঙ্গে নব্য দল এনসিপির অবস্থান ধোঁয়াটে। ‘সংস্কার ও বিচার’-এর আগে নির্বাচন না করার পক্ষে কড়া বক্তব্য উত্থাপনকারী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির সম্প্রতি লন্ডনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরও তাদের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার উত্তরবঙ্গে এক সভায় পুনরায় একই বক্তব্য রেখেছেন। তবু গণতন্ত্রের বৃহত্তম স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের অংশ হিসেবে বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সেটি আনুষ্ঠানিক না অনানুষ্ঠানিক তা দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্তের পর জানা যাবে। ইসলামপন্থি ও তরিকতপন্থি কয়েকটি দলের সঙ্গেও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
