ব্যবসায়ীর বাসায় গৃহকর্মী মার্জিয়া মারা যাওয়ার ঘটনা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। ২০ দিন অতিবাহিত হলেও রামপুরায় বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভ্যাসেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআরভিডা) ট্যাক্স, ট্যারিফ, ভ্যাট ও পলিসি বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এবং দি ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সদস্য মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবরের বাসার গৃহকর্মী কিশোরী মারা যাওয়ার সঠিক কারণ জানাতে পারেননি তিনি ও তার পরিবার।
বাবরের পরিবার মৃগী রোগীর দোহাই দিয়ে মৃত্যুর কথা বললেও কিশোরী মার্জিয়া আক্তারের (১৪) মৃত্যু নিয়ে ধুম্রজাল রয়েছে। মার্জিয়ার মৃত্যু নিয়ে এখানও জবাব মেলেনি বহু প্রশ্নের। বাবরের পরিবার থেকে বলা হচ্ছে কিশোরী মেয়েটির মৃগী রোগী ছিল। গত ৭ এপ্রিল তার নিজ কক্ষে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যায়। অথচ কোনও অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে অবশ্যই পুলিশকে অবহিত করা ছিল বাধ্যতামূলক। তা তিনি করেননি। এমনকি মার্জিয়ার চিকিৎসা বা তার মারা যাওয়া নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোনও হাসাপতালে নেওয়া হয়নি। অথচ তড়িঘরি করে ৭ এপ্রলি রাতে কিশোরীকে ঢাকার বাসার থেকে বাবরের নিজ গাড়িতে (ডিকিতে) করে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল) সকালে উপজেলার উত্তর রামনারায়ণপুর এলাকার মাইজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে মেয়েটিকে দাফন করা হয়।
স্থানীয়রা জানায়, চাটখিল উপজেলার উত্তর রামনারায়ণপুরের মৃত ডাক্তার নুরুল হক চৌধুরীর ছেলে মাহাবুব হক চৌধুরী বাবর। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তার বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে। নিহত কিশোরী মাহাবুব হক চৌধুরী বাবরের ঢাকার বাসায় কাজ করতেন বলে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, এ ধরনের কোনও ঘটনা তার জানা নেই। কেউ কোনও অভিযোগও করেনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভ্যাসেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআরভিডা) ট্যাক্স, ট্যারিফ, ভ্যাট ও পলিসি বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এবং দি ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সদস্য। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবেও দেশের বাইরে ভ্রমণ করেছেন তিনি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে মাহাবুবুল হকের বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে। রামপুরা বনশ্রীতে তার বসবাস।
তিনি জানান, মেয়েটির বাবা-মা কেউ নেই। দীর্ঘদিন থেকে মেয়েটি তাদের বাড়িতে কাজ করছে। মেয়েটির মৃগীরোগ ছিল। সোমবার(৭ এপ্রিল) দুপুরের খাবার শেষে নিজের রুমে বিশ্রাম নিতে যায়। বিকেল শেষে ঘুম থেকে উঠছে না দেখে রুমে গিয়ে ডাকলে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্য বিবেচনা করে মেয়েটিকে নিজের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বলে জানান মাহাবুবুল হক।
মেয়েটিকে কোনও হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল কিনা এমন প্রশ্নে জানান, মেয়েটি বিকেলে ঘরের ভেতরে মৃত অবস্থাতেই পাওয়া যায়। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত থাকায় তাকে আর হাসপাতালে নেওয়া হয়নি।
মেয়োটির লাশ ঢাকা থেকে পরিবহন করে চাটখিলে আনা হবে এই বিষয়টি স্থানীয় থানা পুলিশ ও চাটখিল থানাকে অবগত করা হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার বাবার লাশ ঢাকা থেকে চাটখিলে নিয়ে কবর দেওয়া হয়েছে, সেসময় তো থানা পুলিশকে জানানোর প্রয়োজন হয়নি। মেয়েটিকে আমি নিজের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে দেখি। এ জন্য প্রশাসনকে বিষয়টি জানানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি।
এ ছাড়া লাশটি অ্যাম্বুল্যান্সে করে নিয়ে আসার কথা বলেছেন মাহাবুবুল হক। তবে এলাকার কেউ অ্যাম্বুল্যান্সটি দেখেনি বলে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে।
মাহাবুবুল হক চৌধুরীর চাটখিলের বাড়ির কেয়ারটেকারের দায়িত্বে রয়েছেন আব্দুল আলী। তিনি জানান, রাত পৌনে বারোটার সময় বাবর সাহেব তাকে মোবাইলে কল দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন ঢাকা বাসার কিশোরী মেয়েটি মারা গেছে। মেয়েটি তার দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। এ জন্য লাশটি বাবর সাহেব নিজের পৈত্রিক কবরস্থানে দাফন করবেন। এরপর ভোর রাতে গাড়িতে করে বাবর সাহেবের মা জাহানারা বেগম, ছোট বোনের জামাই মানিক মিয়া ও তার স্ত্রী লাশ নিয়ে বাড়িতে আসেন। কিভাবে মেয়েটি মারা গেছে তা তিনি শোনেনি। তবে কবর খোঁড়া ও জানাযায় অংশ নিয়েছিলেন।
রামনারায়ণপুরের আলেয়া বেগম সম্পর্কে চৌধুরী বাবরের মামাতো ভায়ের স্ত্রী। তিনি মেয়েটির লাশ গোছলের কাজে সহায়তা করেছিলেন। কিভাবে মেয়েটি মারা গেছে এমন প্রশ্নে জানান, তার ভাবি (বাবরের স্ত্রী) জানিয়েছেন, মেয়েটি তাদের বাড়িতে কাজ করত। সোমবার তাকে রান্নাঘরের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে ভাবি বাজারে চলে যান। পরে বাসার ফিরে মেয়েটিকে রান্নাঘরের মেঝেতে মৃত পড়ে থাকতে দেখেন।
রাম নারায়ণপুরের আব্দুল মালেক জানান, তিনি মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবরের মামাতো ভাই। খুব ভোরে প্রাইভেটকারে করে মেয়েটির লাশ এখানে আনা হয়। যার লাশ দাফন করা হয়েছে সেই মেয়েটি বাবরের ঢাকার বাড়িতে গত তিন বছর থেকে গৃহপরিচারীকার কাজ করত বলে তিনি জেনেছেন।
এ বিষয়ে চাটখিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফিরোজ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, চাটখিলের উত্তর রামনারায়ণপুরে ঢাকা থেকে আনা কিশোরীর লাশ দাফনের বিষয়ে অফিসিয়ালি তিনি কিছুই জানেন না। তবে লোকমুখে এমন ঘটনার বিষয়ে তিনি শুনেছেন।
বেবি আক্তার রামনারায়ণপুর ও আশপাশ গ্রামের শতশত নারীকে শেষ গোছল দিয়েছেন। আলোচিত এই কিশোরীর লাশটিও তিনি গোসল করিয়েছেন। সকাল ছয়টার সময় মাইজের বাড়িতে যান তিনি। গোসল করানোর সময় মেয়েটির শরীর নরম ও স্বাভাবিক ছিল। মেয়েটিকে এখানে নিয়ে আসার কিছু সময় পূর্বেই মেয়েছি মারা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মৃত্যুর কারণ তিনি জানতে পেরেছেন কি না এমন প্রশ্নে বলেন, লাশ গোসলের সময় জাহানারা বেগম (বাবরের মা) বলেছেন, মেয়েটির মৃগী রোগ ছিল। রান্নাঘরে কাজ করার সময় ওভেনে ইলেকট্রিক শকের কারণে সে মারা গেছে।
মাহাবুবুল হকের পরিবার নিহত মেয়েটিকে তাদের বাড়ির কাজের মেয়ে বলে প্রচার করেছেন গ্রামবাসীর কাছে। তবে মেয়েটি আদৌও গৃহকর্মী কি না তার প্রমাণ মেলেনি। তাছাড়া ঢাকা থেকে আনা লাশ চাটখিলে দাফনের বিষয়ে নানা রহস্যের জন্ম দিচ্ছে জনমনে।
