দূরপাল্লার চালকদের মানবেতর জীবন

আপডেট : ০১ মে ২০২৫, ০৭:৪১ এএম

মুকুল হোসেন পাবনা থেকে সাতক্ষীরাগামী পরিবহনের চালক। ভোর ৫টারও আগে গ্যারেজ থেকে গাড়ি নিয়ে যান বাস টার্মিনালে। সকাল সাড়ে ৬টায় যাত্রী নিয়ে ছয় ঘণ্টার বিরতিহীন যাত্রায় তিনি পৌঁছান গন্তব্যে। আধা ঘণ্টা বিরতির পর ফিরতি যাত্রায় পৌঁছান পাবনায়। প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করলেও তার স্থায়ী নিয়োগপত্র নেই; নেই নির্ধারিত বেতন-ভাতা। ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি কাজ করছেন দিনমজুরির চুক্তিতে।

পাবনার মুকুল হোসেনই শুধু নন, উত্তরবঙ্গের সব পরিবহন শ্রমিকের ক্ষেত্রে চিত্র একই। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক কোনো শ্রমিককে আট ঘণ্টার বেশি কাজ না করানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ পরিবহন শ্রমিককেই কাজ করতে হয় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। মালিক চাইলেই ছাঁটাই হয়ে যান তারা। পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগও তারা পান না। দূরপাল্লার যাত্রায় একাধিক চালক থাকার আইন থাকলেও ৪০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে একটানা গাড়ি চালাতে বাধ্য হন বাস-ট্রাকের চালকরা।

পরিবহন শ্রমিকরা জানান, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, নিয়োগপত্র, নির্ধারিত বেতন বা মজুরি নেই মফস্বলে কর্মরত দূরপাল্লার পরিবহন শ্রমিকদের। বিশ্রামের ফুরসত না থাকায় টানা পরিশ্রমে চালক-শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে; সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটছে। শ্রম আইন কার্যকরে তদারকির অভাব ও মালিকদের অতি মুনাফার লোভে ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত পরিবহন শ্রমিকরা।

দূরপাল্লার বাসচালক মুকুল হোসেন বলেন, ‘মোটরযান আইনে বলা আছে, টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি একজন চালক যান চালাতে পারবেন না। বিশ্রাম নিয়ে দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারবেন। অথচ বাস, ট্রাক বা লরি দূরপাল্লার কোনো পরিবহনেই তার প্রয়োগ দেখতে পাবেন না। আমাদের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। রোগ, শোক, উৎসবে ভাতা নেই। কাজে না এলে বেতন নেই। কোনো প্রতিকারও নেই। মালিক চাইলেই মুহূর্তে চাকরি চলে যেতে পারে।’

পরিবহন শ্রমিক আশরাফ হোসেন রবি বলেন, ‘মে দিবস এলেই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আর বৈষম্য দূর করার আলাপ ওঠে। মিছিলে সেøাগানে গলা ফাটান শ্রমিক নেতারা। বছর শেষে পরিণতি­ হচ্ছে, হবে। একজন বাসচালককে পাবনা থেকে কক্সবাজার বা চট্টগ্রামে যেতে হলে তাকে সংকীর্ণ সিটে বসে টানা ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে হয়। মুনাফা কমে যাবে বলে পরিবহন মালিকরা একাধিক চালকের বাধ্যবাধকতা মানেন না। সরকারের কোনো তদারকি নেই। অথচ দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা হই ঘাতক চালক। সব দায়ভার শ্রমিকদের। মে দিবস পরিবহন শ্রমিকদের জন্য আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কোনো অধিকারই আমরা আদায় করতে পারিনি।’

পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহীসহ কয়েকটি জেলার বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, পরিবহন শ্রমিকদের কর্মস্থলের পরিবেশ চরম অস্বাস্থ্যকর। টার্মিনালগুলোয় পৌরসভা-সিটি করপোরেশনের মার্কেট, দোকানপাট থাকলেও শ্রমিকদের বিশ্রাম, খাবার বা গোসলের ব্যবস্থা বলতে গেলে নেই। দূরপাল্লার যাত্রা শেষে গ্রীষ্মের প্রচ- গরমে শ্রমিকরা একটু বিশ্রামের জন্য আশ্রয় নেন গাছতলায়, চায়ের দোকানে। অনেকে অন্য কোথাও জায়গা না পেয়ে গা এলিয়ে দেন তপ্ত বাসের সিটেই। টার্মিনালের খাবারের দোকানগুলোও নোংরা।

সিরাজগঞ্জের ষাটোর্ধ্ব বাসচালক আবদুর রহিম বলেন, ‘চল্লিশ বছর ধরে বাস চালাই। শরীরে আর কুলায় না। কিন্তু আমার তো পেনশন নেই। দিনমজুর। হয়তো আর বেশিদিন কাজ করতে পারব না। সামনে কী হবে জানি না।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শ্রমিককল্যাণের নামে প্রতিদিন চাঁদা উঠলেও, অধিকার আদায়ে, সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় তারা গত ৫০ বছরে কী করতে পেরেছে? শ্রমিক নেতারা বিলাসী জীবনযাপন করে। আর মালিক ও সরকারের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে চলে। শ্রম আইন ও ২০০৬ সালের সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করা হলেও পরিবহন শ্রমিকরা কিছুটা নিরাপদ জীবন পেতেন।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, ‘বিগত দিনে শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। ২০১৮ সালে কালো আইন করে পরিবহন শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা হুমকিতে ফেলা হয়েছে। আমরা পরিবর্তিত সময়ে নতুন করে চেষ্টা করছি পরিবহন শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার। সব বৈষম্যমূলক আইন বাতিলে ও অধিকার আদায়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। আশা করি, সরকার সহায়তা করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত