মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘাত ও সেখানে বেসামরিক প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ‘মানবিক করিডর’ গঠনের প্রস্তাবের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখনো করিডর নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা আসেনি। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, জাতিসংঘের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে শর্ত ঠিক হয়নি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এ বক্তব্যের পরই রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন পক্ষ থেকে নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, করিডর দেওয়ার বিষয়টি সংসদে আলোচনা করে নির্ধারণ করতে হবে। এ ছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজনের দাবি করা হয়েছে।
যদিও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যের পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, করিডর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই করিডর দেওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন দেশে মানবিক করিডর দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ দুদিকই আছে। তবে তারা মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক করিডর কার্যকর করতে হলে জাতিসংঘ, আসিয়ান এবং চীন-ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন। নতুবা এটি রাজনৈতিক বক্তব্য হয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বাংলাদেশ দাবি করছে, রাখাইন অঞ্চলে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদে সহায়তা পৌঁছাতে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবিক করিডর প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে।
সরকারি অবস্থান : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন করে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে রাখাইনে আটকে পড়া অসহায় রোহিঙ্গাদের জন্য একটি ‘নিরাপদ ও মানবিক করিডর’ খোলা দরকার। বিশেষ করে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই, জাতিসংঘ বা আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ত্রাণসামগ্রী, খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানবিক করিডর এক প্রকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সহায়তা রুট, যা সংঘাতময় এলাকায় বসবাসরত বেসামরিকদের সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতির ওপর।’ তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক করিডর কার্যকর করতে হলে জাতিসংঘ, আসিয়ান এবং চীন-ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন। নতুবা, এটি রাজনৈতিক বক্তব্য হয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক মহলে সমর্থন আদায়ের এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ এ ঘোষণাকে মানবিকতার চেয়ে রাজনৈতিক দৃষ্টি প্রলোভনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘যেখানে দেশের ভেতরে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার যথাযথ ব্যবস্থাপনাই সম্ভব হয়নি, সেখানে রাখাইনের ভেতরে করিডর গঠনের প্রস্তাব শুধু কূটনৈতিক আলোচনার নাটক হতে পারে।’
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তবর্তী গ্রামে আটকা পড়েছে। জাতিসংঘ ও রেড ক্রস ইতিমধ্যেই কিছু এলাকায় মানবিক সহায়তা পাঠানোর চেষ্টা করলেও অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাজনিত বাধার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
জাতিসংঘের সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক মানবিক করিডর গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সম্মতি অপরিহার্য। আর যেহেতু মিয়ানমার সরকার এখনো রাখাইনে সহায়তার প্রবেশ অনুমোদন দিচ্ছে না, বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাব বাস্তবায়ন বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া সম্ভব নয়।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি : বিশ্লেষকরা বলেন, মানবিক করিডর একটি উচ্চাভিলাষী কৌশল, তবে মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা সরকারকে চাপ প্রয়োগ ছাড়া এটি কার্যকর হওয়া কঠিন। অন্যপক্ষে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান জাতিসংঘে এমন কোনো উদ্যোগকে ভেটো দিতে পারে। মানবিক করিডরের অপব্যবহারও আশঙ্কার বিষয়। অস্ত্র পাচার, সামরিক গোয়েন্দাগিরি বা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার জন্য এর অপব্যবহার হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত রাখাইন করিডর আন্তর্জাতিক নীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি সফল হলে রোহিঙ্গা সংকটের অবসানের পথে একটি মানবিক ও কূটনৈতিক আশাবাদ তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে আন্তর্জাতিক সমন্বয়, চাপ এবং বাস্তবতাভিত্তিক পরিকল্পনা।
