দলের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন চান সালাহউদ্দিন

আপডেট : ১২ মে ২০২৫, ০১:২৯ এএম

অনেক সম্ভাবনার গান আর আশার আলোর ঝলকানির পরও আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১০ নম্বরে। টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়েও অবস্থান ভালো নয়। ক্রিকেটারদের মাঠের পারফরম্যান্সেও আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু নেই। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দলের ভেতরকার সংস্কৃতির পরিবর্তন চান জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। আসন্ন আরব আমিরাত ও পাকিস্তান সফরকে সামনে রেখে চলমান প্রস্তুতি ক্যাম্পের অগ্রগতি জানাতে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন সালাহউদ্দিন। নানান প্রশ্নে উত্তরের গতিপথ হয়েছে গোলকধাঁধা, তবে মোদ্দাকথা যেটা বলতে চেয়েছেন যে খেলোয়াড়দের মনোজগতে আর দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতে পরিবর্তন না আনলে পাক খেয়ে যেতে হবে ব্যর্থতার দুষ্টচক্রে।

সালাহউদ্দিনের কাজটা  ব্যাটিং নিয়ে। ব্যাটিংটাই বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা, বড় মঞ্চে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বারবার তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়েছে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার। এই অসুখ সারাতে কোন কৌশল তিনি যুক্ত করলেন এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিনের উত্তর, ‘দেখুন ড্রিল তো আপনি আমাকে যদি বলেন তাহলে এখানে বসে  বসে ১০০টা ড্রিল বানিয়ে দিতে পারব। আসলে খেলাটা মাথায়, আমরা কীভাবে ক্যালকুলেশন করছি, আমরা কি লজিক মেনে ক্রিকেট খেলছি কি না। আমার মনে হয় মাঝে মাঝে আমরা লজিক ছাড়া ক্রিকেট খেলি। ঐ জায়গাটায় উন্নতি করা খুব দরকার। স্কিল বলেন, টেকনিক বলেন, আপনিও যেভাবে খেলেন আমিও সেভাবে খেলি। তাহলে কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই সমস্যা আছে, সমস্যাটা মাথায়। এটা শুধু বললাম আর হয়ে গেলাম এ রকম না। এটা অনেক কালচারাল একটা ব্যাপার। যে জিনিসগুলো নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি, এই জায়গাটায় অনেক তাড়াতাড়ি আমাদের উন্নতি করতে হবে। যেমন রেস্পনসিবিলিটির কথা বলা হচ্ছে, আমরা ভাবছি সেটা ছেলেদের ওপরই ছেড়ে দিতে। তাহলে তারা শিখবে, একজন আরেকজনকে কোচিং করাবে। নিজেরা নিজেদের ক্রিকেট নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে। আমরা চেষ্টা করছি ছেলেরা যেন নিজেরাই দায়িত্ববান হয়ে নিজেদের প্রবলেমটা সলভ করতে পারবে।’

প্রায় মিনিট ত্রিশেক স্থায়ী সংবাদ সম্মেলনে ঘুরে ফিরে এসেছে অনেক প্রসঙ্গই। যার অনেকগুলোরই উত্তর সালাহউদ্দিনের এখতিয়ারের বাইরে। মেহেদী হাসান মিরাজ কেন দলে নেই বা বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান সফরের সম্ভাবনা, এসব প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিনের কীই-বা বলার আছে! তার নিজের চাকরিই তো এখন ঝুলছে শূন্যের ওপর, ১৫ মার্চ মেয়াদপূর্তির পর হয়নি নতুন করে চুক্তি সই। তবুও আশাবাদী হয়ে বলেছেন অনেক কিছুই, যার মধ্যে আছে দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি বদলানোর সাহসী বক্তব্য। কারও ব্যাটিং অর্ডার নির্দিষ্ট পছন্দের ওপর নির্ভর করবে না, জাতীয় দলের প্রয়োজনে যাকে যেখানে ব্যাট করার ব্যাপারে টিম ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নেবে তাকে সেই সিদ্ধান্তই মানতে হবে, নয়তো দল থেকে চলে যেতে হবে। নিজের জন্য নয়, দলের জন্য খেলতে হবে, ‘কে আগে কোথায় ব্যাটিং করেছে সেটা ম্যাটার করে না। দলের জন্য যেটা হেল্পফুল, সেটাই করতে হবে। সেটা ভালো না লাগলে আপনার এখানে খেলার দরকার নেই’, এভাবেই বলেছেন সালাহউদ্দিন। এসব বক্তব্য শুনতে ভালো লাগে, তবে কতটা এসব প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ  বাংলাদেশ দলে ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ড পরিচালকদের সরাসরি যোগাযোগের ফলে মাঝে কোচ হয়ে পড়েন ব্রাত্য, তার কথা ড্রেসিং রুমে অরণ্যে রোদন। চ-িকা  হাথুরুসিংহের প্রথম আমল বাদ দিলে স্টিভ রোডস, রাসেল ডমিঙ্গোরা কেউই খেলোয়াড়দের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেননি। কথিত পা-বরা তাদের ইচ্ছেমতো ব্যাটিং অর্ডার বেছেছেন, বোলিং অর্ডার বেছেছেন, এমনকি কোন সিরিজে বিশ্রাম নেবেন সেসব সিদ্ধান্তও নিয়েছেন স্বেচ্ছাচারী কায়দায়। সেখানে সালাহউদ্দিনের কথায় কতটা চিঁড়া ভিজবে সেটা সময়ই বলে দেবে।

টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক করা হয়েছে লিটন দাসকে। বিকেএসপি সূত্রে দুজনের ভেতর আগে থেকেই হৃদ্যতার সম্পর্ক বিদ্যমান। নতুন ভূমিকায় লিটনকে দেখে আশাবাদী সালাহউদ্দিন, তার ধারণা বদল এসেছে লিটনের মনোজগতে, ‘সবারই উন্নতি করার অনেক জায়গা আছে। ব্যাটসম্যান হিসেবে, মানুষ হিসেবে। লিটনকে আগে যা দেখেছি, এর সঙ্গে সবশেষ সিরিজে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখেছি। সে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।’ বাংলাদেশের অধিনায়কের কাজটা কেন কঠিন এই প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিনের ব্যাখ্যা, ‘আমরা সবাই মিলে পারফর্ম করি না। ভালো পারফর্ম করলে অধিনায়কত্ব করা সহজ হতো। একইসঙ্গে আমরা অনেক ইমোশনাল। তবে অধিনায়ক হিসেবে সব চাপই নিতে হবে। সব কিছু হ্যান্ডেল করতে হবে। পারফরম্যান্সের গ্রাফ ওপরে উঠলে সহজ হবে তার জন্য।’ লিটনকে তার পরামর্শ, ‘একটা জিনিস শেখানোর চেষ্টা করছি। এখানে দায়িত্ব নেওয়ার সময় সুনামের সঙ্গে সমালোচনাও নিয়ে এসেছি। এটা হ্যান্ডেল করাও শিখতে হবে। তার এসব শিখতে হবে।’

সব মিলিয়ে সালাহউদ্দিনের বক্তব্যের সারকথা, কারও একক প্রচেষ্টায় কোনো কিছু হবে না। কাজ করতে হবে সার্বিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘জাতীয় দলের ওপরেই সব নির্ভর করে না। এইচপি, ‘এ’ দলের পাশাপাশি স্ট্রাকচার কেমন আছে, সব মিলিয়েই আসলে বোঝা যায় যে আমরা কোথায় যাব। শুধু গুটিকয়েক ক্রিকেটারের ওপর একটা দেশের ক্রিকেট নির্ভর করে না। সবাই মিলেই এটা করতে হবে। ডেভেলপমেন্ট, এইচপি, টাইগার্স ও জাতীয় দলের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি যারা আছে তাদেরও একই লক্ষ্য থাকতে হবে।’ সমস্যা হচ্ছে, এসবের  বাইরে প্রভাবশালী ক্লাবের পরিচালকদের অনেকেরই নিজস্ব লক্ষ্য থাকে। দেশের ক্রিকেটের লক্ষ্যের চেয়ে সেসব লক্ষ্য পূরণেই যে বিসিবি বেশি মনোযোগী! প্রথম পরিবর্তন আনা দরকার এই সংস্কৃতিরই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত