রাজনৈতিক দলটি অপাঙ্ক্তেয় হলো যে কারণে

আপডেট : ১৬ মে ২০২৫, ০১:১৭ এএম

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ১৯৫৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগের আজকের দুই হাজার পঁচিশ। আওয়ামী লীগের প্রায় ৭০ বছরের এই কার্যপরিধিকে আমরা দুটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। সময়গত দিক থেকে বলা যায় এক. পাকিস্তান পর্যায়। দুই. বাংলাদেশ পর্যায়। এই দুই সময়ে দলটির ভূমিকা কখনো ছিল রাজনৈতিক আবার কখনোবা রাষ্ট্রনৈতিক। পাকিস্তান পর্যায়ের সময়টা ঊনপঞ্চাশ থেকে একাত্তর। এ সময়ের কার্যপরিধির বেশিরভাগ সময়টাই ছিল রাজনৈতিক। এর মধ্যে যদিও যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় কিছুটা ভূমিকা ছিল রাষ্ট্রনৈতিক। কিন্তু বাকি পুরোটা সময়ই দলটি ভূমিকা রেখেছে, এমনকি নেতৃত্ব দিয়েছে এই ভূখণ্ডের আপামর মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া পাকি শাসকদের বৈষম্য, নিপীড়ন আর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। প্রায় ৭০ বছরের সংগ্রামমুখী এই দলটি আজ গণধিকৃত। রাষ্ট্রিকভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু কেন? সেই কেনর উত্তর খুঁজতেই এই নিবন্ধের অবতারণা। সেদিন থেকে এদেশের মানুষ বুঝতে পারে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সর্বাত্মক সমর্থন করে তারা ভুল করেছে। বাংলা অঞ্চলের মানুষের সেই ভুলকে পুঁজি করে তখন থেকেই এই দলটি আপামরের অধিকার, মর্যাদা, স্বাধিকার, প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামে সবসময়ই এগিয়ে রেখেছে নিজেকে। প্রথম দিকে গোটা পাকিস্তানের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অনুভূতিকে বিবেচনায় নিয়ে নিজেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে পরিচিত করালেও খুব দ্রুতই মুসলিম অভিধাটি ঝেড়ে ফেলে শরীর থেকে।

পাকিস্তানি শাসকদের ধর্মের নামে মানুষের আর্থ-সামাজিক ও সর্বোপরি রাষ্ট্রনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়াকে বৈধ করার যাবতীয় প্রয়াসবিরুদ্ধতায় বরাবরই সোচ্চার থেকেছে এই দলটি। পাকিস্তানি শাসন-শোষণ আর নিপীড়ন বিরুদ্ধতায় দেশের সব মানুষকে এককাতারে নিয়ে আসার কাজে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখে দলটি। অবিসংবাদিত এক নেতা হয়ে ওঠেন দলের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান। দল হিসেবে এমনিতর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে, শাসকদের সঙ্গে অনেক সময়েই করতে হয়েছে আপসরফা। চূড়ান্ত বিজয় অর্জনেও নিতে হয়েছে সর্বাত্মক সহযোগিতা! বলা বাহুল্য, একাত্তর পরবর্তীকালেও এই দলটির ভূমিকা ছিল উপরেল্লিখিত দুটি পর্যায়ের মতোই।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্রনৈতিক পর্যায় : এর মধ্যে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ম্ুিক্তযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্য সব দল ও গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততাকে অস্বীকার করে একদলীয় ও একচ্ছত্র শাসনকাঠামো প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব অর্জন করে দলটি। অথচ এই দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যাকে কিনা স্বাধীনতা অর্জনের একমাত্র কারিগর হিসেবে রাজমুকুটে অভিষিক্ত করেছিল এদেশের মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে হয়ে ওঠেন ‘ক্ষমতার মানুষ’, ‘ক্ষমতাবানদের মানুষ’! পরিবার, দল আর স্বজন তোষণের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিজেকে নিয়ে যান। বেপরোয়া আর জনবিরুদ্ধ করে তোলেন নিজেকে, সে সঙ্গে পরিবার ও স্বজনদেরও। একক নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয় আর রাষ্ট্রক্ষমতার জোরে একসময়ের জনসম্পৃক্ত দলটি হয়ে পড়ে জনবিচ্ছিন্ন ও জনধিক্কৃত। পরিণতি হয় জনপ্রত্যাখ্যান!

পঁচাত্তর পরবর্তী একুশ বছরের রাজনৈতিক পর্যায় : পঁচাত্তরে রাষ্ট্রনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে দেশে এক প্রকার কবর রচিত হয় অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুত্ববাদী রাজনৈতিক প্রপঞ্চের। রাষ্ট্রনৈতিক সিদ্ধান্তেই, প্রয়োজন মতো সংবিধান সংশোধন করে আইনি বৈধতা দেওয়া হয় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চর্চার অর্গল খুলে দিতে। ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সে সময় তিনি ছোট বোন শেখ রেহানাসহ সপরিবারে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। সেসময় তিনি তার বাবা-মাসহ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে খুনের বিচারের ভার দেশের মানুষের কাছে ছেড়ে দেন। সুযোগ চান রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন করতে! সমর্থনও পেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের। এই সময়টাতেও দলটি শুধুই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য ছিয়াশি সালে স্বৈরাচারী এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করলেও, আওয়ামী লীগ স্বাধীনতাবিরুদ্ধ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়। জামায়াত নির্বাচনে ১০টি সংসদীয় আসন পায়! আওয়ামী লীগ সেসময়ে নির্বাচনে না গেলে জামায়াত এভাবে প্রথমবারের মতো দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীজন হয়ে উঠতে পারত না। 

নব্বইয়ের কথিত গণতন্ত্র অভিযাত্রায় আওয়ামী লীগ : একানব্বইতে দলনিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিজেদের ১৪০ এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৮টি আসনের সমর্থন নিয়ে জোটগতভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি। তখন স্বৈরাচারবিরুদ্ধ সংগ্রামজাত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়তা কিংবা বাধ্য করার বদলে শুধুই রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ। প্রথমে সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন করলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে সরকার থেকে পদত্যাগ করে জামায়াতে ইসলামী।  একই সঙ্গে সরকারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য ও সহাবস্থান গড়ে তোলে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় অভিযুক্ত দলটি। এভাবেই দ্বিদলীয় রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদলের আন্দোলন-সংগ্রামে এরা কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বা বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতা পাইয়ে দিতে পালন করে অন্যতম সহায়ক শক্তির ভূমিকা। হয়ে ওঠে রাষ্ট্রনৈতিক সমীকরণের এক প্রকার নিয়ামক শক্তি। মুখ্যত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পতিত স্বৈরাচার এরশাদসহ স্বাধীনতাবিরুদ্ধ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত আন্দোলনে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যে ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দীর্ঘ একুশ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয় আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ প্রথম দফায় (১৯৯৬-২০০১) রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে জনগ্রাহ্যতা ধরে রাখতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিস্তার ও অসাম্প্রদায়িকতা চর্চায় কিছুটা হলেও মনোনিবেশ করে আওয়ামী লীগ। মূলত শহুরে অভিজাত শ্রেণির সমর্থন আর বামপন্থিদের চাপ ও তাপে তারা যে এমনটা করতে বাধ্য হয়েছিল সেটা বোঝা যায়। বিশেষ করে, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর।

সাংবিধানিক স্বৈরাচারিতা ও রাজনৈতিক ইসলাম : ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী বিএনপি ও জামায়াত জোটের সর্বাত্মক নির্যাতন-নিপীড়ন আর ২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাইনাস টু ফর্মুলার শিকার হওয়ার মধ্য দিয়ে বিস্তর পরিবর্তন আসে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক চরিত্রে। এই সময়টাতে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনাতেই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতিবিরুদ্ধ বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ইস্যুতেও পেরেক ঠুকতে হয় আওয়ামী লীগকে। বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চারনীতি পুনর্বহাল করা হলেও জারি রাখা হয় স্বৈরাচারী এরশাদের করা সংবিধানস্বীকৃত রাষ্ট্রধর্ম-ইসলাম। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশনে একাত্তরের মানবতাবিরুদ্ধ অপরাধীদের ত্রুটিপূর্ণ বিচার ও রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দেওয়া হয় অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীকে। কথিত জঙ্গি দমনের নামে ওয়াকওভার দেওয়া হয় জনবিরুদ্ধ রাজনৈতিক ইসলামকে। যার কার্যকর বিস্তার ঘটতে শুরু করেছে আশির দশকের শুরুতে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অভিগম্যতার সুবাদে। প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি দেশের আবহমান সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশ ঘটে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ওহাবি তথা রাজনৈতিক ইসলামের সংস্কৃতির। আগে থেকেই বিদ্যমান মাদ্রাসা শিক্ষাভিত্তিক অনুৎপাদনশীল বিশাল এক জনগোষ্ঠীর বিকাশনে রাষ্ট্রিক সুযোগ-সুবিধায় হালে পানি পায় রাজনৈতিক ইসলামের এই সংস্কৃতি। সে সঙ্গে ধর্মীয় এই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব হেফাজতে ইসলামীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা হয়! এদের দাবির মুখে নারী ও প্রগতিবিরুদ্ধ ১৩ দফা চুক্তি। এদের অর্জিত দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স পর্যায়ের স্বীকৃতি। গণতন্ত্রের নিয়ামক নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থাসহ রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে সরকারের আজ্ঞাবহ করে তোলা হয়। পরিণত করা হয়, অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে । আর্থ-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়। উন্নয়নের নামে করা হয় জনগণের করের টাকার সীমাহীন তসরুফ। সর্বোপরি আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বক্ষেত্রে এককভাবে ভারতনির্ভরতা সৃষ্টি হলো। 

সংগতকারণেই বিগত এক দশক ধরে সাংবিধানিক এই একব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামোর সংস্কারের জোর দাবি উঠে রাজনৈতিক পরিসরে। যার জেরে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের জন্ম হয়। যে জনঅভ্যুত্থান দমন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার খুন করেছে হাজারো তরুণ, শিক্ষার্থী আর সাধারণ মানুষকে। শেষ পর্যন্ত পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে মনোবৈকলিক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে। পালিয়ে যেতে হয়েছে দলের শীর্ষ ও মাঝারি স্তরের সব নেতৃবৃন্দকে। শুধু এতেই থেমে থাকেনি দলটির দেশ ও জনবিরুদ্ধ কার্যক্রমের পরিণতি। হতে হচ্ছে বিচারের সম্মুখীন। বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ থাকছে দলটির যাবতীয় কার্যক্রম। সবশেষ বাতিল হয়েছে রাষ্ট্রিক নিবন্ধনও। এরপর...?

লেখক: সাংবাদিক ও আহ্বায়ক

রাষ্ট্রচিন্তা (ঢাকা মহানগর)

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত