বারবার সরকার বদলালেও ভাগ্য বদলায়নি বুড়িগঙ্গার

আপডেট : ১৮ মে ২০২৫, ০৫:২০ পিএম

যে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা, সেই নদীকেই তীলে তীলে ধ্বংস করেছে ঢাকাবাসী। বুড়িগঙ্গা নদীর পানির প্রতিটি ফোটায় এখন বিষের মাত্রা এতোটাই ভয়াবহ যে, ময়লা খেকো সাকার ফিসের অস্তিত্বও এখন আর নেই। গত দুই যুগে কয়েকবার সরকার পরিবর্তন হলেও বুড়িগঙ্গা রক্ষায় উল্লেখযোগ্য কাজ করেনি কেউ। দখলে দূষণে বুড়িগঙ্গা এখন একটি মরা নদীতে পরিণত হয়েছে।

গত ২০ বছরে রাজধানী ঢাকা ঘিরে উন্নয়ন পরিকল্পনার ছাড়াছড়ি। উন্নয়নের ছোয়ায় প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে ঢাকা। বহুতল ভবন উঠছে, মেট্রোরেল ছুটছে আকাশপথে। কিন্তু একই সময়ে ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা রক্ষায় নেওয়া হয়নি চোখে পড়ার মতো কোন পদক্ষেপ। যাও নেওয়া হয়েছে সেগুলোও লোক দেখানো, কাগজে কলমে আর কারি কারি অর্থ ব্যয়ের মধ্যই সীমাবদ্ধ। বুড়িগঙ্গা রক্ষায় বিগত সরকার আমলে যত প্রজেক্ট করা হয়েছে এবং যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে, সেগুলো আসলে খরচ করা হয়েছে কি না, নাকি বেশির ভাগই দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় আসার পরে বুড়িগঙ্গা পুনুরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান, ড্রেজিং, ওয়াক ওয়ে নির্মানসহ নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ ছিল কিছু সময়ের জন্য। ধারবাহিকতা ছিল না বলেই, কিছু দিন পরপরই আগের মতোই দখল হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা।

দখল দূষণ আর সরকারি অবহেলায় এক সময়ের স্বচ্ছল বুড়িগঙ্গা আজ বিষাক্ত এক জলধারায় রূপ নিয়েছে। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হয়েছে, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি ছুটেছে- তবুও বুড়িগঙ্গার গায়ে লেগে তাকা কালো পানি ও দুর্গন্ধ মুছে যায়নি।

সরেজমিন বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গার দুই তীরের বাসিন্দারা অলিখিত এক প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে কত বেশি দূষিত করতে পারে। দুই তীরের বাসা বাড়ির বর্জ্য, কলকারাখানার বর্জ্য সরাসরি এসে বুড়িগঙ্গার পানিতে পড়ে দূষিত করছে নদীকে। এছাড়া লঞ্চ, ইস্টিমার, ট্রলারসহ অন্যান্য নৌযানগুলোর তেল, মবিল ও বর্জ্য তো আছেই। দেখে মনে হয় বুড়িগঙ্গা যেন এখন আর নদী নয়, ভাসমান একটি ময়লার ভাগাড়।

গত ৩০ বছর ধরে বুড়িগঙ্গায় নৌকা চালানো আ. রহিম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৯৯৭/১৯৯৮ সালের পর থেকে বুড়িগঙ্গার পানি আস্তে আস্তে খারাপ হইতে শুরু করে। এক সময় নৌকা বাইতে গিয়া পানি পিপাশা পাইলে আমরা এই নদীর পানি খাইসি, গোসল করসি, কতো স্মৃতি এই নদী ঘিড়ে। এহন তো দেখলেই কেমন লাগে। পচা গন্ধ পানির। বাধ্য হয়েই আমরা নৌকা বাই এহন। 

কেরানীগঞ্জের আগানগরের স্থায়ী বাসিন্দা মো. সায়েম বলেন, এক সময় এই নদীতে মাছ ধরেছি, নদীর তীরে কতো খেলেছি বন্ধুদের সাথে। এখন তো পানি দেখলেই কেমন লাগে। কতো সরকার আসে কতো সরকার যায়, কতো প্রকল্প হাতে নেয় বুড়িগঙ্গার, কিন্তু সেইগুলো কাগজে কলমেই থাকে, বাস্তবায়ন আর হয় না। বর্তমান সরকার আমাদের সরকার, বর্তমান সরকারের উচিত ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করতে দ্রুত ব্যবস্থা হাতে নেওয়া।

স্থানীয় ফার্মাসিস্ট সাদ্দাম হোসেন বলেন, বুড়িগঙ্গা এখন নিজের বুকে বিষ বহন করছে। সরকারের প্রতিটি দপ্তরের ফাইলে ফাইলে বুড়িগঙ্গা নিয়ে পরিকল্পনা আছে কিন্তু বাস্তবে নেই কোন কার্যকরি পরিবর্তন।

মো. আব্দুল্লাহ নামে ওয়াজঘাট এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, বিগত সরকার ঘোষণা দিয়েছিল এটাকে টেমস নদী করবে, কতো কিছু করবে, কিন্তু বাস্তবে এটা যে একটা নদী তাই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। দুই পারের যত ময়লা আছে সব এখানে ফেলা হয়, এছাড়া ওই পাড়ের (কেরানীগঞ্জের) যত অবৈধ ডায়িং কারখানা আছে সবগুলার বিষাক্ত ক্যামিক্যাল এই নদীতে পড়ে। এই সরকার নদীকে বাঁচাতে পদক্ষেপ নিক, আমরা সরকারের সকল পদক্ষেপ কে সাধুবাদ জানাবো। আমরা ২৫ বছর আগের বুড়িগঙ্গা, সরকারের কাছে ফেরত চাই।

২০২৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিদিন ১৬০ কোটি লিটার তরল বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। এর মধ্যে ৬০% কল কারখানার ও ৪০% বাসা বাড়ির বর্জ্য। বুড়িগঙ্গার পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শুন্যের কোটায় নেমে এসেছে। জীব বৈচিত্র হারিয়ে গেছে। মাছ নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার প্রায় ৪৫০ একর জমি দখল হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ ইট বালুর ঘর, বসতবাড়ি, দোকানপাট, এমনকি সরকারি স্থাপনাও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী বাঁচাতে দরকার আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, কঠোর আইন প্রয়োগ, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

সম্প্রতি রিভার আন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কামরাঙ্গীচর থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার দুই পারে ২৫১ টি সোয়ারেজের পাইপ লাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত বর্জ্য এসে বুড়িগঙ্গায় পড়ে। বুড়িগঙ্গার প্রায় ৪০ শতাংশ দূষন ই হচ্ছে এই পাইপ লাইনগুলোর মাধ্যমে। রিভার আন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের পক্ষ থেকে এই পাইপ লাইনগুলো পাগলা পয়োশোধানাগারে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। মাত্র ২৫-৩০ কোটি টাকা ব্যয়েই এটি সম্ভব বলে জানানো হয়।

বুড়িগঙ্গা রক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, বিগত সময়ের সরকাররা বুড়িগঙ্গা নিয়ে যত পদক্ষেপ নিয়েছেন তা শুধু কাগজে কলমেই রয়ে গেছে আর অনেক টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক রূপে কাজ কিছুই হয়নি। বুড়িগঙ্গা রক্ষা করতে হলে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পরিকল্পিত প্ল্যান দরকার। সিটি করপোরশনের বর্জ্য, ওয়াসার বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় পড়ছে, এছাড়া পলিথিন জাতীয় বর্জ্যও বুড়িগঙ্গায় বেশি রয়েছে। এগুলো শোধন না করা হলে আর বর্জ্য যদি সরাসরি বুড়িগঙ্গায় পড়ে তাহলে কিছুতেই বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো সম্ভব না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে পরিবেশ বিষয়ক ও দেশের নদীগুলো বাচাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি আশাবাদী বর্তমান সরকার বুড়িগঙ্গা বাচাতে কার্যকর পদক্ষেপ দ্রুত সময়ের মধ্যই নিবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, বুড়িগঙ্গাসহ দেশের অন্যান্য নদীর দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখা কাজ করছে। এছাড়াও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত