মেয়র পদে শপথ ইস্যু

ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি আসিফ-ইশরাক ব্লকেডে বঞ্চিত সেবা

আপডেট : ২০ মে ২০২৫, ০৭:১০ এএম

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদের শপথ দেওয়া-নেওয়াকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এবং বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। নিজেদের ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে উভয়ের প্রতি ক্ষোভ ঝাড়েন তারা। এদিকে ইশরাককে মেয়র পদে শপথ পড়ানোর দাবিতে ষষ্ঠ দিনের মতো নগর ভবনে তালা ঝুলিয়ে সড়ক বন্ধ করে বিক্ষোভ করেছেন নেতাকর্মীরা। এতে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং নগর ভবন বন্ধ থাকায় সেবা নিতে আসা নাগরিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

গতকাল সোমবার বিকেলে ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দাবি করেন, গায়ের জোরে নগর ভবন বন্ধ করে বিএনপি আন্দোলন করছে। মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসেনের শপথ না হওয়ার পেছনে ১০টি জটিলতার কথা উল্লেখ করেন। জটিলতা নিরসন হলে ইশরাককে শপথ দিতে কোনো আপত্তি নেই।

গতকাল অন্য এক পোস্টে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের ‘কতিপয় ব্যক্তি’কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘সর্বশক্তি দিয়ে এরা ঢাকায় বিএনপির মেয়র আটকানোর চেষ্টার মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে কী ভূমিকা পালন করবে, তা ক্লিনকাট (পরিষ্কার) বুঝিয়ে দিল।’ স্থানীয় সরকার উপদেষ্টাকে ইঙ্গিত করে তিনি লেখেন, ‘কোনো কথা চলবে না, যারা নিরপেক্ষতা শুধু বিসর্জন দিয়েছে নয়; বরং একটি দলের প্রতিনিধির কাজ করেছে, তাদের অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। এরা হাসিনার মতোই বিচারকদের হুমকি দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করছে। উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করেছে এবং আমলাতন্ত্রে হাসিনার দোসরদের সঙ্গে নিয়ে লম্বা কুচক্র পরিকল্পনা করছে। একদিন এদের সবার নাম পরিচয় প্রকাশ পাবে।’

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ইশরাক হোসেন লেখেন, ‘মেয়র ফেওর কিছু না। অন্তর্বর্তী সরকারের কতিপয় ব্যক্তির অন্তরে ক্ষমতার লোভ ও এটি চিরস্থায়ী করার কুৎসিত সত্যটা বের করে আনাটাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। অনেক সমালোচনা মাথা পেতে নিয়েছি, পিতা-মাতা তুলে গালিগালাজও চুপ করে সহ্য করে গিয়েছি। কারণ একটাই, এদের চেহারা উন্মোচন করতে হবে গণতন্ত্রের স্বার্থে, জনগণের ভোটের অধিকারের স্বার্থে।

হাসিনারেও বলছিলাম, “কবরটা ঠিক করাই আছে, আল্লাহর হুকুম থাকলে সেখানেই হবে, ইনশাআল্লাহ।” লড়াই শেষ হয় নাই। হয় দাবি আদায় করব, না হয় আল্লাহর নির্ধারিত স্থানে মাটির নিচে শায়িত হব। গণতন্ত্রের সঙ্গে, জনগণের ভোটের অধিকারের সঙ্গে একচুল ছাড় হবে না।’

শপথ না পড়ানোর ১০ কারণ : উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ তার পোস্টে শপথ না পড়ানোর ১০টি কারণ উল্লেখ করেন। ‘প্রথমত, আরজি সংশোধন অবৈধ মর্মে হাইকোর্টের রায় ভায়োলেট করে নির্বাচন কমিশন ট্রাইব্যুনাল এই রায় প্রদান করেছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন শুনানিতে অংশগ্রহণ না করায় একপাক্ষিক রায় হয়েছে এবং পরবর্তীতে কমিশন আপিলও করেনি। তৃতীয়ত, আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হলেও মতামত দেওয়ার আগেই এবং একই সঙ্গে দুজন নাগরিকের পাঠানো লিগ্যাল নোটিস উপেক্ষা করে রাত ১০টায় গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। চতুর্থত, উক্ত মামলায় স্থানীয় সরকার বিভাগ পক্ষভুক্ত ছিল না এবং রায়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতি কোনো নির্দেশনার উল্লেখ নেই। পঞ্চমত, শপথ না দেওয়ার কারণে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার বিভাগকে বিবাদী করে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে, যা এখনো বিচারাধীন। ষষ্ঠত, বরিশাল সিটি করপোরেশন-সংক্রান্ত মামলায়, আরজি সংশোধন-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়কে আমলে নিয়ে খারিজ করেছে ট্রাইব্যুনাল। ফলে ট্রাইব্যুনালের দ্বিমুখী অবস্থান বোধগম্য হচ্ছে না। সপ্তমত, মেয়াদ-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিয়েছে; কত দিন মেয়র থাকবেন বা আদৌ মেয়াদ আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। অষ্টমত, নির্বাচন কমিশনের চিঠিতে “কানো প্রকার আইনি জটিলতা না থাকলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ” এর কথা বলা হয়েছে। স্পষ্টতই বিতর্কিত রায়, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতি কোনো নির্দেশনা না থাকা, লিগ্যাল নোটিস এবং রিট পিটিশন বিচারাধীন থাকা-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা রয়েছে। নবমত, এই জটিলতা নিরসনে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। দশমত, আওয়ামী আমলের অবৈধ নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দেওয়ার প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি স্বীকার করে যে আওয়ামী আমলের নির্বাচনগুলো বৈধ, তবে সরকারের জন্য এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না।’

উচ্চ আদালতে বিচারাধীন এবং উল্লিখিত এসব জটিলতা নিরসন না করা পর্যন্ত শপথ গ্রহণ সম্ভব নয় উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বরং গায়ের জোরে আদায় করার উদ্দেশ্যেই নগর ভবন বন্ধ করে মহানগর বিএনপি এ আন্দোলন চালাচ্ছে। ফলে সিটি করপোরেশনের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়াসহ জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব জটিলতা নিরসন হলে স্থানীয় সরকার বিভাগের শপথ দিতে কোনো সমস্যা নেই।’

ব্লকেড কর্মসূচি, অচল নগর ভবন : ডিএসসিসির প্রধান কার্যালয় নগর ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে গতকালও বিক্ষোভ করেছেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার কিছু আগপর্যন্ত গুলিস্তান মাজার এলাকায় সড়কের একপাশ বন্ধ করে বিক্ষোভ করেন ইশরাকের সমর্থকরা। ট্রাক এবং দড়ি দিয়ে সড়ক বন্ধ করে অবস্থান নেন তারা। ফলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় গুলিস্তান-সদরঘাট সড়কে। পরে দুই পাশেই যানজট ছড়িয়ে পড়ে।

গুলিস্তান মাজার থেকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার পর্যন্ত এলাকা দখলে রাখেন ইশরাকের সমর্থকরা। নগর ভবন থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো মাইকে চলে স্লোগান। ছোট ছোট মিছিল বের হয়। নগর ভবনের প্রধান ফটকের সামনে বেশ কয়েকজন সংগীতশিল্পীও অংশ নেন। তারা নানা ধরনের গান পরিবেশন করে আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করেন।

‘ঢাকাবাসী’ ব্যানারে আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনে বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আবারও নগর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক সচিব মশিউর রহমান। বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা বলছেন, যত দিন না ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানো হবে, তত দিন তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

ইশরাকের সমর্থকদের দাবি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কারণেই আদালতের রায় ও নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশের পরও ইশরাক শপথ নিতে পারছেন না। এ সময় উপদেষ্টার ছবি নিয়ে ‘আপত্তিকর’ কিছু কর্মকা- করেন কতিপয় নেতাকর্মী।

গতকাল বিকেলে দেওয়া ওই ফেসবুক পোস্টে এমন একটি ছবিও যুক্ত করেছেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। ছবি প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধে ইশরাক হোসেনের এই আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক কার্যক্রমের কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না! আবার কেউ বলবেন না যে এটা সাধারণ জনগণ করছে; কারণ, বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন গ্রুপের নির্দেশনা এবং গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী দলীয় নেতাকর্মীরাই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।’

বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র ঘোষণা করে গত ২৭ মার্চ রায় দেন ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল। রায়ের পর ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করে ২৭ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। মেয়র হিসেবে ইশরাকের শপথের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার পরও কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় গত বুধবার থেকে তার সমর্থকরা নগর ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন।

ইশরাকের পক্ষে মামলার রায় ও নির্বাচন কমিশনের আপিল না করার বিষয়ে কোনো আইনি জটিলতা আছে কি না, সে সম্পর্কে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার আইন ও বিচার বিভাগে চিঠি দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত