অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে এখনই সরাসরি বিরোধে জড়াতে চায় না বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তারা অন্তত আরও দুই মাস সরকারের পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করবে। এর মধ্যে নির্বাচন নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ বা দিনক্ষণ ঘোষণা না এলে কিংবা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া গেলে রাজপথে আন্দোলনের দিকে যেতে পারে। তবে সেই কর্মসূচির আগে মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
গত সোমবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব আলোচনা হয়। বৈঠকটি শুরু হয় রাত সাড়ে ৮টায় এবং শেষ হয় রাত সাড়ে ১১টায়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। অনলাইনে যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
বৈঠকে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা ও বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নেতারা। তারা মনে করেন, কিছু অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করেই বিভিন্ন পক্ষ রাজপথে নামছে, যা একটি পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। এসবের পেছনে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিএনপি নেতারা।
বিএনপি নেতাদের মতে, ছাত্রদের রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন দাবি তুলে রাজপথে নামা ভবিষ্যতে বড় ধরনের অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন, রাষ্ট্রপতি অপসারণ, সংবিধান বাতিল, গণভোট বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস্যুতে এ সংগঠনগুলো ভিন্নধর্মী পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যা সরকার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হতে পারে।
বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে, সরকার এখনো নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেনি বরং সংস্কার ও নির্বাচনের বিষয়কে মুখোমুখি করে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সরকারের একটি অংশ বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে এবং একটি মদদপুষ্ট দলকে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা করছে, যা নির্বাচনের পেছনে ফেলার কৌশল হতে পারে।
দলটির অভিমত, এই প্রক্রিয়া সফল হলে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে এবং দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে এক ধরনের ভাঙন তৈরি হবে। একই সঙ্গে ‘পতিত আওয়ামী লীগ’কে পুনর্বাসনের পথও সুগম হবে বলে মনে করেন তারা।
যদিও বৈঠকে দু-একজন নেতা ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের পরামর্শ দেন, তবে অধিকাংশ সদস্যের মতে এখনো রাজপথে নামার সময় আসেনি। ১৫ মে বৃহস্পতিবার দি ইকোনমিস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচন চলতি বছরের ডিসেম্বরে আয়োজন করা হতে পারে। তবে আগামী জুনের পরে নয়। এমন সংবাদ নিয়ে আলোচনার পর দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখনো সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসার প্রত্যাশা করছে বিএনপি।
বৈঠকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে ইশরাক হোসেনের শপথ না হওয়া নিয়েও আলোচনা হয়। আদালতের রায় এবং নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশের পরও শপথ গ্রহণে বিলম্ব করায় অসন্তোষ জানায় বিএনপি। দলটির মতে, এমন পরিস্থিতিতে ইশরাক হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত। তার পক্ষে কর্মী-সমর্থক ও ঢাকাবাসীর বিক্ষোভকে যৌক্তিক ও ন্যায্য বলেও অভিহিত করে বিএনপি।
স্থানীয় নির্বাচন চাওয়া মানে জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা : নজরুল
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘শুনছি অনেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন স্থানীয় সরকার নির্বাচনও চাচ্ছে। এটা সম্ভব নয়। অন্তর্বর্তী সরকার তৈরি হয় শুধু জাতীয় নির্বাচনের জন্য। আমরা সবাই জানি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে এক বছরের বেশি সময় লাগবে। এসব বলার মানে, জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা করা।’
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রতিষ্ঠাতা শফিউল আলম প্রধানের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে শফিউল আলম প্রধানের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় নজরুল ইসলাম খান এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নানা বাধা তৈরি করা হচ্ছে। সংস্কার আর গণতন্ত্রকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে। অনেক রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে নানা কায়দায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অভিযাত্রাকে বিলম্বিত করতে চায়। কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কিংবা গোষ্ঠীর স্বার্থে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে চায়। অনেকে বলে আমরা নাকি সংস্কার চাই না, আমাদের চেয়ে বেশি সংস্কার তো কেউ চায় কি না।’
জাগপা সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রিয়াজের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনডিপির চেয়ারম্যান আবু তাহের, সাম্যবাদী দলের সৈয়দ নুরুল ইসলাম প্রমুখ।
