নীল রঙে শিল্পী ডি ব্রুইনের তুলির শেষ আঁচড়

আপডেট : ২২ মে ২০২৫, ১২:৩১ এএম

ম্যানচেস্টারের ইতিহাদ স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার রাতে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই স্পষ্ট ছিল, এই রাত কেবল এক ম্যাচের জন্য নয়, যেন এক যুগসন্ধিক্ষণের। স্টেডিয়ামের চারপাশে সাঁটা পোস্টারে শুধু একজনের মুখ, ভক্তদের গায়ে তার নামের স্কার্ফ, জার্সি সবই ছিল তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ। ইতিহাদের পাশেই কো-অপ লাইভ অ্যারেনায় মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন মার্কিন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন। তবে মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ ইতিহাদে, শেষবারের মতো এখানকার সবুজ গালিচায় নামতে যাচ্ছেন ম্যানসিটি কিংবদন্তি কেভিন ডি ব্রুইন।

বোর্নমাউথের বিপক্ষে ম্যানসিটির ম্যাচটিতে মাঠে প্রতিবার ডি ব্রুইনের পায়ে বল এলেই গুঞ্জন উঠছিল গ্যালারিতে। শেষবারের মতো প্রিয় তারকার পায়ে একটি গোল কিংবা অ্যাসিস্ট দেখতে চাচ্ছিলেন সবাই। আর সেই সিনেম্যাটিক মুহূর্তে যখন গোল পোস্টের সামনে খালি জায়গায় বল পেয়ে গেলেন, তখনো কেউ বুঝতে পারেনি কী হতে চলেছে। ধীরগতিতে বলটি উঠে গেল বার ঘেঁষে গোল মিস! ৩৩ বছর বয়সী এ বেলজিয়ান তারকা মাথায় হাত দিয়ে প্রকাশ করলেন আক্ষেপ। বেঞ্চে থাকা রদ্রিও মুখ ঢেকে ফেললেন, আর গ্যালারিতে নেমে এলো হতাশার নিঃশ্বাস। ডি ব্রুইন পরে নিজেই বলেন, ‘ভয়ানক ভুল। কোনো অজুহাত নেই। আজ আমার ছেলে খুব কঠিন প্রশ্ন করবে।’

৬৯ মিনিটে মাঠ ছাড়লেন, ডাগআউটে তাকে আলিঙ্গনে বাঁধলেন সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা। ক্যামেরা জুম হতেই ধরা পড়ল গার্দিওলার জল ছলছলে চোখ। ৩-১ ব্যবধানে জেতা ম্যাচটি শেষের পর বড় স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ডি ব্রুইনের এক দশকের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো। পাশাপাশি উঠে আসে আগুয়েরো, কোম্পানি, স্টার্লিং, জাবালেতার মতো সতীর্থদের বার্তা। এরপর পরিবারের সঙ্গে মাঠে ফিরে আসেন কেভিন। সতীর্থদের তৈরি গার্ড অব অনার পেরিয়ে যখন তিনি মাঠে আসেন, গ্যালারিতে তখন সমবেত কণ্ঠ ‘আমরা চাই তুমি থাকো, কেভিন ডি ব্রুইন।’ সবকিছুই ফুরোয়, সেই ইঙ্গিতই দিয়ে ডি ব্রুইন করলেন গ্যালারির চারপাশে শেষবারের মতো ল্যাপ অব অনার।

গার্দিওলা কেভিনকে এতটাই সম্মান করেন যে, লিওনেল মেসির পর তাকেই নিজের ক্যারিয়ারে দেখা দ্বিতীয় সেরা ‘পাসার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রিমিয়ার লিগে অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ডি ব্রুইন খেলেছেন ২৮৪ ম্যাচ, ৭২ গোলের সঙ্গে আছে ১১৯টি অ্যাসিস্ট। সব মিলিয়ে সিটির হয়ে ৪২১ ম্যাচে তার গোল ১০৮টি এবং অ্যাসিস্ট ১৭৭টি। এই সময়ের মধ্যে লিগে ১৯০টি গোলে অবদান রেখে তিনি আছেন চতুর্থ স্থানে মো. সালাহ, হ্যারি কেইন এবং সন হিউং-মিনের পরে। তবে সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে তিনি ছিলেন একচ্ছত্র আধিপত্যে। এই সময়ের মধ্যে তৈরি করেছেন ৮৪৩টি গোলের সুযোগ, যেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেস (৫৩৫) আছেন অনেক পিছিয়ে। বোর্নমাউথের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ডি ব্রুইনের ১৪২তম এবং শেষ হোম লিগ ম্যাচ। প্রিমিয়ার লিগে সিটির হয়ে এই স্টেডিয়ামে তার চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন কেবল ডেভিড সিলভা (১৬০টি)। সিটির প্রতি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ডি ব্রুইন বলেন, ‘এটা আমার ঘর, আমার পরিবার। আমার সন্তানরা এখন ম্যানক (ম্যানচেস্টারের স্থানীয় বাসিন্দা)।’

১৬টি শিরোপা জেতা নিজেদের এই কিংবদন্তিকে সম্মান জানাতে পিছপা হয়নি ক্লাব কর্র্তৃপক্ষও। একাডেমিতে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে, গড়া হবে ভাস্কর্যও। শহরের নর্দার্ন কোয়ার্টারে আঁকা হয়েছে বিশাল এক ম্যুরাল, যেভাবে ডি ব্রুইন তার খেলায় ফুটবলকে রূপ দিয়েছেন শিল্পে। এখনো দেবেন, তবে ঘরের ক্যানভাসে নীল রঙের তুলিতে শেষ আঁচড়টি দিয়ে দিলেন এ শিল্পী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত