‘যত শিক্ষিত তত বেকারত্ব’

আপডেট : ২৩ মে ২০২৫, ১২:০৮ এএম

শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য মানবসম্পদের উন্নয়ন ও বিকাশ। কিন্তু আমাদের দেশে যে উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে, তা কোনোভাবেই সময়ের চাহিদা মেটাতে পারছে না, মননের তো নয়ই। গলদটা আসলে গোড়ায়। ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থা আজও পরিবর্তিত হয়নি। তারা কেরানি তৈরির যে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল, সেই ব্যবস্থা এখনো চলছে। যে কারণে শিক্ষিত বেকার বাড়ছে অথচ কর্মমুখী শিক্ষিত বাড়ছে না। প্রতিবছর দেশের জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। একই সঙ্গে যার যত শিক্ষা, তার বেকার থাকার ঝুঁকি তত বাড়ছে। ২০২২ সালে একজন তরুণ ‘ভাতের বিনিময়ে পড়ানোর বিজ্ঞাপন’ দেওয়ার পর করোনা মহামারীতে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি কতটা সংকট তৈরি করেছিল তার করুণ চিত্র হিসেবে এটি সামনে এসেছিল। বেকারত্ব আর হতাশা যে কত বড় সংকট তৈরি করতে পারে, সেটা উঠেছিল সেই তরুণের বিজ্ঞাপনে। আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা কোনোভাবেই শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হচ্ছে, তার বাস্তব প্রয়োগ নেই। দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারেও তাদের চাহিদা প্রায় শূন্য।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যে দেশ ও বিশ্ব শ্রমবাজারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সে কথা অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে। এমনকি এটাও বলা হয়েছে, শুধু উচ্চশিক্ষাই যথেষ্ট নয় দরকার যথাযথ দক্ষতা ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানবিক শিক্ষা। সেই কথা আবারও স্পষ্টভাবে জানাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। তারা বলছে, ‘যত শিক্ষিত হচ্ছে, তত বেকারত্ব বাড়ছে। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নেই। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে কীভাবে উদ্যোক্তা হওয়া যায়, সে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।’ বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘যুবদের সংস্কার ভাবনা : কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তাদের আলোচনায় এ কথা বলা হয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এই সেমিনারের আয়োজন করে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন চমৎকার একটি কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘দেশের উচ্চশিক্ষা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।’ তার মতে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হচ্ছে, তার বাস্তব প্রয়োগ নেই, বাজারেও চাহিদা নেই। ফলে যত শিক্ষিত হচ্ছেন, তত বেকারত্ব বাড়ছে।’ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রচলিত ধারণা ভাঙতে হবে যে সরকারি চাকরিই একমাত্র গন্তব্য। কারিগরি স্কিল দিয়ে ছোট একটি উদ্যোগ শুরু করলেও সম্মানজনক কর্মসংস্থান সম্ভব।’

সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হচ্ছেন। চাকরি না পেয়ে শিক্ষিত এসব তরুণ-তরুণীর কেউ মানবেতর জীবনযাপন করছেন, কেউ বেঁচে থাকার জন্য বেছে নিচ্ছেন ভিন্নপথ। কারিগরি শিক্ষাহীনতাই কর্মসংস্থানে যদি মূল প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে সেভাবে কারিকুলামে পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু আমাদের আর্থিক যোগ্যতা কতটুকু? সে কারণে বাজেটে শিক্ষার বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। সাধারণত যেসব চাকরিতে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার মতো সুযোগ ও কাঠামো থাকে, সেগুলোই আনুষ্ঠানিক কর্ম খাতের অন্তর্ভুক্ত। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে বিশ্বে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত হয়ে বের হওয়ার পরও চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ভাবতে হবে, শিক্ষার গুণগত মান অর্জন করতে চাইলে ও বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে, সেভাবে শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলা হোক। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্টরা কী চাইছেন? এ বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সমাজে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার রেখে কোনোভাবেই স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধিশালী ও শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ গড়ে উঠবে না। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত