কর্মসংস্থান সংকটে বিদেশমুখী নোয়াখালীর যুবকরা

আপডেট : ২৩ মে ২০২৫, ০২:৪১ পিএম

নোয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের অলি-গলি সবখানেই আজ একটাই চিত্র। একের পর এক যুবক বিদেশ গমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশীদের চোখে গর্বিত ‘বিদেশফেরত’ হবার স্বপ্ন তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই প্রবাসমুখিতা কেবল মর্যাদার নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা, কর্মসংস্থানের অভাব।

স্থানীয় চাকরির সংকট, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগের ঘাটতি, বিদেশে উচ্চআয়ের স্বপ্ন, সামাজিক চাপে বিদেশ যাত্রা, আবার কারো রয়েছে বিদেশে পরিবার নিয়ে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন। এ অঞ্চলে একসময় বেকার যুবকদের বিদেশ যাবার প্রবণতা বেশি থাকলেও নোয়াখালীর শিক্ষিত যুবকরাই এখন সামাজিক মর্যাদার অযুহাতে বেশি বিদেশমুখী। উচ্চমাধ্যমিক পাস করা বেশিরভাগ ছাত্র কেউ স্টুডেট ভিসায়, কেউ ওয়ার্ক ভিসায় বিদেশ গমনে ছুটছে।

সরেজমিনে স্থানীয় পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন পাসপোর্ট করতে যুবকরাই বেশি ভিড় করছে। এদের প্রায় সকলের উদ্দেশ্য বিদেশে পাড়ি জমানো।

ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগরীকে এ অঞ্চলের শিল্পপতিরা বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও নোয়াখালী জেলায় উল্লেখযোগ্য হারে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এতে কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি দিন দিন চাপ বাড়ছে। শহর এলাকাগুলোতে সেসব চাকরি আছে তা মূলত খুচরা দোকান, এনজিও ও প্রাইভেট সেক্টরে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া শ্রমআইন অনুযায়ী আট ঘণ্টা কাজ করার কথা থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বার থেকে ষোল ঘণ্টা কাজ করতে হয়। ওভারটাইম এর বেতনও থাকছে না।

নোয়াখালীর ছয়ানি এলাকার থেকে ইউরোপের পোল্যান্ড এ অবস্থান করা প্রবাসী স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী রবিউল হোসেনের বলেন, আমার স্বপ্ন ইউরোপে স্থায়ী হওয়া। বিশ হাজার টাকা বেতনে দেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পদে চাকরি করতাম। কিন্তু দ্রব্যমূল্য, মা-বাবার ওষধ খরচ, সন্তানের লেখাপড়া সবমিলিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলাম। একজন রিকশা শ্রমিক ও দিন মজুর আমার চেয়ে বেশি আয় করে। পোল্যান্ডে এসেছি ছয় মাস। এখানে দেড় লাখ টাকা বেতনে চাকরি করছি। আমার মতো অনেকেই করছে। এখানে কি কাজ করছি কেউ দেখছে না। সবচেয়ে বড় কথা সেনজেনে পাসপোর্টধারী হলে পরিবার নিয়ে ইউরোপে সেটেল হতে পারব।

শিক্ষজীবন শেষ করে ইউরোপের যাবার জন্য ফাইল জমা দেওয়া জাবেদ হোসেন বলেন, কয়েক জায়গায় চাকরি চেষ্টা করেছি। ইন্টারভিউ ভালো হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পরিচিতদের নিয়োগ দিচ্ছে। পতিত সরকারের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় লোক নিয়োগের কারণে চাকরি হয়নি। এখন আর এদেশে চাকরির ইচ্ছাও নেই।

বিদেশগমচ্ছেু এরকম কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ইউরোপে নন সেনজেন দেশগুলোতে আট থেকে দশ লক্ষ টাকা, সেনজেন কান্ট্রিগুলোতে তের থেকে পঁচিশ লক্ষ টাকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চাকরির জন্য তিন থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করছে। অনেকে আবার বিদেশ যাবার ক্ষেত্রে প্রতারিতও হচ্ছে। কয়েকবারে চেষ্টায় কেউ ভিসা পেয়ে বিদেশ গিয়েছে। বেশিরভাগ যুবকরাই এ টাকা জোগাড় করছে ব্যাংক লোন, জমি বিক্রি, আত্মীয় স্বজন থেকে ধার কর্য ও অথবা পরিবারের গয়না বিক্রির টাকায়।

বিদেশ যাবার ক্ষেত্রে যে বিশাল অংকের টাকা খরচ করছে তা দিয়ে দেশে ব্যবসা করছে না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে কারো মতে- দেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে পুঁজি ভেঙে খাওয়ার কথা বলে কেউ টাকা ধার দিতে চায় না। আত্মীয়স্বজনরা ভাবে বিদেশ গিয়ে হাওলাতী টাকা তাড়াতাড়ি পরিশোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভালো পজিশনে দোকান নেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যাডভান্স ও দোকানভাড়াকেই দুষছেন তারা। পারিবারিক মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষিত আত্মমর্যাদার কথা বিবেচনা করে অল্পপুঁজিতে লাভজনক ব্যবসায় পুঁজি বিনোয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে না। প্রতারিত হবার সম্ভাবনা থেকে অনেকে যৌথ বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারে সময় সীমাহীন দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক হামলা মামলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে অনেকে চাকরির বয়স হারিয়ে শেষমেস বিদেশ যাওয়াকেই সমীচীন বলে মনে করে।

ট্রাভেলস মালিক গাজী ফখরুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে আসা সেবাগ্রহিতাদের বেশিরভাগই বিদেশে কর্মসংস্থানের পাসপোর্ট জমা দেয়। বিদেশে গমনে টাকা বেশি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরাও চাই এর পরিমাণ কম হোক।

এর জন্য বিমানভাড়া, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ম্যানপাওয়ার ও দূতাবাসের বিভিন্ন প্রসেসিং জটিলতাকে তিনি দোষারোপ করে বলেন, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সকল কনসুলেট অফিসের যাবতীয় কার্যক্রম দ্রুত বাংলাদেশে চালু করতে পারলে ও প্রশাসনিক জটিলতা সহজ করতে পারলে বিদেশ গমনেচ্ছুদের খরচ কমবে ও দ্রুত ভিসা নিশ্চিত হবে।

নোয়াখালী জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মুকিত হাসান যুবকদের অতিরিক্ত বিদেশমুখিতা প্রসঙ্গে তিনটি করণে উল্লেখ করে বলেন, উপকূলীয় দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় এই এলাকার জনগণ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকেই মাইগ্রেশন প্রবণ। জনসংখ্যা অনুযায়ী সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের অভাব। ব্যবসা বাণিজ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রেডলাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরিতে ওয়ানস্পট সার্ভিস না থাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত