নদীদূষণে বিপন্ন জীবন

আপডেট : ২৪ মে ২০২৫, ১২:৪৬ এএম

নদীবিধৌত আমাদের দেশে ছোট-বড় মোট ২৩০টি নদী রয়েছে। শাখা-প্রশাখাসহ নদীর সংখ্যা প্রায় ৮০০। এই নদীগুলো মানব শরীরের শিরা-উপশিরার মতো। বিআইডব্লিউটিএর মতে, ১৯৭১ সালে দেশে প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার জায়গা নিয়ে ছিল নদ-নদী। বর্তমানে যা মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। এই ৬ হাজারের অধিকাংশই দূষণে জর্জরিত। এমন করুণ চিত্র আমাদের সমাজের একটি রাক্ষুসে শ্রেণিকে চিহ্নিত করে। সবাই জানে, কিন্তু কিছুই বলতে পারে না। যেখানে সরকারই চেয়ে চেয়ে দেখে, সেখানে সাধারণ মানুষ কোন শক্তিতে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করবে? ফলে দখল-দূষণ চলছে। দেশব্যাপী নদী তীরবর্তী যে লাখ লাখ মানুষ রয়েছে, যাদের জীবন-জীবিকা নদীকেন্দ্রিক, তাদের রক্ষা করার কেউ নেই। এমন আত্মকেন্দ্রিক মানুষ দুনিয়াতে বিরল।

চারশ বছর আগে ঢাকার নগরায়ণ শুরু হয়েছিল, বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে। যে নদীকে একসময় লন্ডনের টেমস নদীর সঙ্গে তুলনা করা  হতো। বর্তমানে সেই নদীর নাম কী হতে পারে! হয়তো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো নদ-নদী শাখার নাম হতে পারে বৃদ্ধ-কৃশকায়-চর্মরোগে আক্রান্ত বুড়িগঙ্গার। তার হলো কী! দখল-দূষণে কেমন আছে বুড়িগঙ্গা? শুধুই কি এই নদী? শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, পাশর্^বর্তী সিটির কঠিন বর্জ্য এবং নৌযানের বর্জ্য মিলিয়ে দেশের নদীগুলো ক্রমেই ভয়ংকর দূষিত হচ্ছে। অথচ কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। এবার চাঁদপুরের মেঘনা নদীর করুণ দৃশ্য ফুটে উঠেছে। জানা যাচ্ছে, বিষাক্ত বর্জ্য ও কেমিক্যালযুক্ত পানির কারণে মরে ভেসে উঠছে দেশীয় মাছ। কয়েক দিন ধরে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে দশানি পর্যন্ত মেঘনাপাড়ের বিভিন্ন স্থানে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে নদীপাড়ের মানুষজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। দূষিত হওয়ার কারণে নদীর পানি খাওয়া ও ব্যবহার করতে পারছে না স্থানীয়রা। মতলব উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার দাস বলেছেন, ‘এটি নিছক মাছ মরার ঘটনা নয়, এটি একটি জলজ পরিবেশগত দুর্যোগ। শীতলক্ষ্যা নদী থেকে আসা দূষিত পানির প্রবাহ একাধিকবার এই এলাকায় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এটি প্রথম নয়, একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে।’

গত দুই দশকে বাংলাদেশের নদীগুলোতে ভারী ধাতুর কারণে দূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদ, চিৎকার কোনো কিছুতেই নদী দূষণ থামছে না। দিন দিন বেড়ে চলেছে। নদীর পানিতে ভাসছে কলকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনা। বিকট দুর্গন্ধ ছড়ায় নদী থেকে। স্থানীয়রা থাকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। শুধু মেঘনা নয় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরীসহ অসংখ্য নদীর একই দশা। অনেক নদ-নদীতে জলজ প্রাণীর জীবনধারণ করার জন্য পানির মান যা থাকা উচিত, তার চেয়ে মান অনেক কম। সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, নদীকে মানুষের মতো একটি জীবন্ত সত্তার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নদী এখন থেকে প্রাণীর মতো আইনি অধিকার পাবে। নদীর ক্ষতির বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যাবে।  কিন্তু আদালতের দ্বারস্থ হলে ন্যায্য সমাধান আসবে না জেনেই কেউ তেমন আগ্রহ দেখায় না। আবার একশ্রেণির চোখ রাঙানি তো আছেই। সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায় আছে এসব দূষণ তদারকিতে। কিন্তু কে কতটা দূষণ করছে, তা নিয়ে একে অন্যকে দোষ চাপায়। পরিবেশ অধিদপ্তর বলে, পয়ঃবর্জ্যরে কারণে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। ঢাকা ওয়াসা পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলছে, শিল্পকারখানার বর্জ্যে দূষণ বাড়ছে। এটা নিয়ন্ত্রণের দায় পরিবেশ অধিদপ্তরের। অথচ দূষণ রোধে কেউ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ভুলে না যাই, নদী মরলে খাওয়ার পানির অভাবে মানুষ মরবে। মাছ ও জলজ প্রাণীর বাসস্থান নিশ্চিহ্ন হবে। 

নদী কৃষিকাজ ও মাছ ধরার উৎস হলেও, এখন তা শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে ব্যবহার-অনুপযোগী। নদীগুলো আগের রূপে ফিরিয়ে নিতে শিল্প-কারখানা, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন পরিবেশবিদরা। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন, জীবিকা। একই সঙ্গে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির জোগান হুমকির মুখে পড়বে। বিপন্ন হবে মানুষ, হারিয়ে যাবে নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাচীন পরিচয়। একসময় হাপিত্যেশ করেও লাভ হবে না। সময় কিছুটা আছে, সতর্ক হোন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত