নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাসে জলই ছিল গর্বের বাহন। আশি-নব্বইয়ের দশকে সাঁতারের জগতে সেই গর্বকে যেন মূর্ত রূপ দিয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এক সময় ছিল যখন দেশের পুলে নামত দুই দল একটা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আরেকটা গোটা বাংলাদেশ। জেলা থেকে উঠে এসেছেন জুয়েল আহমেদ, শাহজাহান আলি রনি ও তানিয়া আফরিনের মতো সাঁতারুরা। অথচ সময়ের স্রোতে ভাটার টান পড়েছে সেই ঐতিহ্যে। একসময়ের জলদখল এখন স্মৃতির তরঙ্গে ভেসে বেড়ায়। এখন সেই জায়গা দখল করেছে বিকেএসপি নতুন শাসক, নতুন শক্তি।
৩৭তম জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় তাদের সোনালি সাফল্য যেন জল ছাপিয়ে উঠেছে আকাশে ৬৯টি স্বর্ণপদক! আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ? প্রথম পাঁচেও নেই, তাদের প্রাপ্তি শুধু দুটি সোনার কণা, যা হয়তো একদিনের জোয়ারের স্মারক মাত্র।
৬৯ স্বর্ণের পাশাপাশি রৌপ্য ৬২টি ও ব্রোঞ্জ ৩১টি পেয়েছে বিকেএসপি। বাংলাদেশের ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি মোট পদক জিতেছে ১৬২টি। আর ৬টি স্বর্ণপদক জিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা কুষ্টিয়ার আমলা সুইমিং ক্লাব মোট পদক জিতেছে ১১টি। ৫ স্বর্ণ জেতা রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থা তৃতীয় হলেও পদক জিতেছে ১৮টি।
আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও দুটি ক্লাব মিলিয়ে তারা মোট পদক জিতেছে ৭টি। যার মধ্যে জেলাটির ড্যাফোডিল সুইমিং ক্লাব জিতেছে ২টি স্বর্ণপদক ও ১টি ব্রোঞ্জ। রাকিব সুইমিং ক্লাব জিতেছে ৩টি ব্রোঞ্জ, আর জেলা ক্রীড়া সংস্থা জিতেছে মাত্র ১টি ব্রোঞ্জ। অথচ এই জেলাতেই একটা সময় যেত ভূরি ভূরি পদক।
কিন্তু এই অধঃপতন কেন? জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সদস্য ও সাঁতারের জেলা কোচ মো. খালেকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অযতœ আর অবহেলায় রাখা হয়েছিল সাঁতারকে। যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারা এদিকে মনোযোগ দেননি। নিজেদের ক্লাব আর স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, খেলোয়াড়দের স্বার্থ দেখেননি। তাই এতটা পতন হয়েছে।’
জুয়েল আহমেদ, রনি ও তাহমিনারা যখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে উঠে এসেছিলেন তখনো খালেকই ছিলেন এই চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোচ। তখন তাদের জেলায় কোনো সুইমিংপুল ছিল না। চাঁপাই থেকে তারা আসতেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিংপুলে। সেখানে এসে কয়েকদিন তারা সাঁতারুদের নিয়ে ক্যাম্প করতেন। ক্যাম্প করেই প্রস্তুত করতেন দলকে। তারপর ঢাকায় এসে পদক নিয়ে বাড়ি ফিরতেন জেলাটির সাঁতারুরা। শুধু তাই নয়, ১৯৯৩ সালে ৫০ মিটার ব্যাক স্ট্রোকে জুয়েলের গড়া ৩৮.০৩ সেকেন্ডে গড়া রেকর্ডটি আজও অক্ষত। ৩২ বছরেও এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেনি। খালেকের আরেক শিষ্য শাহজাহান আলি রনি ২০০৬ সালে কলোম্বোয় ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে স্বর্ণ জিতেছিলেন। তিনিও এখন জাতীয় প্রশিক্ষক।
২০০৫ সালে চাঁপাইতে সুইমিংপুল নির্মিত হয়। কিন্তু ততদিনে জেলাটির সাঁতারের গর্ব অস্ত গেছে। ১৯৯৬ সাল থেকেই পিছিয়ে যাওয়ার শুরু হয় জেলাটির। জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাছে বারবার বলেও কোনো সমর্থন না পেয়ে জেলার সফল কোচ খালেকুজ্জামানও একসময় অভিমানে সাঁতার ছেড়ে দেন। যোগ দেন করপোরেট একটি প্রতিষ্ঠানে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার দ্বারস্থই হতে হয় জেলার ক্রীড়াবিদদের। চাকরি ছেড়ে এসে দায়িত্ব নেন সাঁতারের জেলা কোচের। প্রতিযোগিতার আগে দেড় মাস সময় পেয়েছিলেন তিনি। সেই প্রস্তুতিতেই তার যে কটি অর্জন।
তার শুরুর সময়ের শিষ্য জুয়েল এখন নৌবাহিনীর পেটি অফিসার। জাতীয় সাঁতার ফেডারেশনের সাঁতারু নির্বাচকও তিনি। দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিকেএসপির সাঁতারুরা যে মানের সুবিধা পেয়ে থাকেন এটা আর কোথাও নেই। আমরা একসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ক্যাম্প করতাম। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত আমরা সেভাবেই সফলতা পেয়েছি। পরের বছর থেকেই সেটা কমতে থাকে। এখন বিকেএসপির সঙ্গে পার্থক্যটা অনেক বেশি। কারণ ঐ মানের সুযোগ-সুবিধা নেই। তারপরও কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, কুষ্টিয়া জেলা ভালো করছে।’
তবে জুয়েলের কণ্ঠে শুধু নিজ জেলাই না। দেশের ৬৪ জেলাতেই সাঁতারুদের যেসব সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন সেগুলো রাখার পক্ষে তিনি। বর্তমানে চলছে সেরা সাঁতারুর খোঁজ। দেশের সব জেলা থেকেই সেরা সাঁতারু খুঁজে আনবেন তারা। তবে জুয়েল বলেন, ‘জেলা পর্যায়ে ভালো সাঁতারু তৈরি করতে হলে প্রত্যেক জেলায় অন্তত একজন ভালো কোচের প্রয়োজন হবে। কোচদের সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে। তাহলে আরও ভালো সাঁতারু তৈরি হবেন দেশে।’
এবারের সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে ৩১টি জেলা ক্রীড়া সংস্থা। বাকি ৩৩টি কোনো প্রতিযোগী পাঠায়নি। এই অনাগ্রহ অনেক প্রশ্ন তোলে। তাছাড়া বিকেএসপির সঙ্গে অন্যান্য ক্লাব ও ক্রীড়া সংস্থার এত পার্থক্যই বা কেন?
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সাঁতার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শাহীন বলেন, ‘এত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও বিভিন্ন জেলার ক্রীড়া সংস্থা ও ক্লাব তাদের সাঁতারু পাঠিয়েছে এবং পদক জিতেছে এটা আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়েছে। আর যারা পাঠাতে পারেননি, তার ব্যর্থতাও আমাদের ফেডারেশনের। কারণ যারা সাঁতারু হবেন, তাদের ভবিষ্যৎ কী? একসময় সাঁতারুরা বিভিন্ন বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারতেন কোটার ভিত্তিতে। এসব তো এখন বন্ধ। এসব উন্মুক্ত করতে হবে, তাদের ভবিষ্যতের পথ তৈরি করে দিতে হবে। তাহলেই সাঁতারে সুদিন ফিরবে।’
চারদিনব্যাপী জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতার ও ডাইভিং প্রতিযোগিতার ৩৭তম আসরের পর্দা নেমেছে। বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশনের সভাপতি ও নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। বিকেএসপির সাঁতারু মনির খান তন্ময় ১০টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে ৯ স্বর্ণ ও ১ ব্রোঞ্জসহ সবগুলোতেই জিতেছেন পদক।
