ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিয়ে সংকটের কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা

আপডেট : ২৬ মে ২০২৫, ০৭:১১ এএম

হঠাৎ করে তৈরি হওয়া অস্থিরতার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে গতকাল রবিবার ২০ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকে আগামীতে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছে দলগুলো।

বৈঠক শেষে যমুনা থেকে বেরিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের কারণে দেশ বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে। এজন্য পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার বলে তিনি মনে করছেন।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘তিনি (ড. ইউনূস) আলোচনা শুরু করেছেন এই কথা বলে যে, আমরা অনেক বড় সংকটের মধ্যে আছি। এ সংকট বলতে তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদ আমাদের এ পরিবর্তনকে একেবারেই স্বীকার করতে চায় না। পারলে আমাদের এক দিনে ধ্বংস করে দিতে চায় এবং সেজন্য যা যা করার দরকার, সব তারা করছে। এই ছিল তার কথা।’

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মান্না জানান, বৈঠকে তারা প্রধান উপদেষ্টাকে রাজনীতি-সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য বলেছেন। সেই সঙ্গে নির্বাচনের তারিখ, নির্বাচনের রূপরেখা এবং কীভাবে নির্বাচন করতে চান, তা প্রধান উপদেষ্টার বলা উচিত বলেও তাকে জানিয়েছেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা তাদের স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কম সংস্কার হলে ডিসেম্বরে আর বেশি সংস্কার হলে জুনে নির্বাচন হবে। এ সময় প্রয়োজনে প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগপত্রে লিখে দিতে চেয়েছেন কোনোভাবেই নির্বাচন জুনের পরে যাবে না।’

দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য দিন দিন দুর্বল হচ্ছে উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এ কারণে প্রধান উপদেষ্টা চিন্তিত ও হতাশ। তিনি আরও বলেন, তারা প্রধান উপদেষ্টাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, জাতীয় ইস্যুগুলোতে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। তাতে প্রধান উপদেষ্টা আশ্বস্ত হয়েছেন।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ রেজাউল করিম বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টাকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না, মানসিক টর্চার করা হচ্ছে, এটা আমরা অনুভব করছি। তাই আমরা তাকে (প্রধান উপদেষ্টাকে) বলেছি, জিতলে একসঙ্গে, হারলেও একসঙ্গে, মাঝখানে রণে ভঙ্গ দেওয়ার চিন্তা বাদ দিতে বলেছি।’ ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন ও ভোটের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিচারের দাবি জানানো হয়।

বৈঠক শেষে খেলাফত মজলিসের নেতা মামুনুল হক বলেন, প্রধান উপদেষ্টা যেন মাঝপথে হাল ছেড়ে না দেন, সেই আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ কোনো সমাধান নয়। তিনি পদত্যাগ করলে এতে সমস্যা না কমে বরং আরও বাড়বে। এজন্য আমরা ইউনূস সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে চাই।’ একই সঙ্গে তিনি নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে কাজ করতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানান।

নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চেয়ে গণসংহতি আন্দোলনের আহ্বায়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি, তাদের বিদেশি সহযোগিতায় অন্তর্বর্তী সরকার, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে।’ তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি রাজনৈতিক ঐক্য এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।

সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চেয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। সমঝোতার মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতিকে এক অবস্থায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা অনেকেই সেখানে মতপ্রকাশ করেছি। আমরা বলেছি, আগামী ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যথাসম্ভব নির্বাচন আয়োজন করার জন্য। তবে সেটা চাপিয়ে দিয়ে নয়, তিনি তার সুবিধামতো সময়ে নির্বাচন করবেন।’

এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা বলেছি, ছাত্রদের যে ঐক্যটা থাকা দরকার ছিল, জেনজি, মাদ্রাসার ছাত্র, পাবলিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র আন্দোলনে ছিল, তাদের ঐক্যটা ধরে রাখা যায়নি। কখনো কখনো ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য উপদেষ্টারা কাজ করেছেন। সব বিষয় বিশ্লেষণ করে স্থিতিশীল অবস্থা তৈরির কথা বলেছি। প্রয়োজনে উপদেষ্টা পরিষদ যদি রিসাফল করতে হবে বলে মনে করেন, সেটা করতে বলেছি। আমরা মনে করি, ইগোর কারণে আজকের এ অবস্থা।’

মঞ্জু বলেন, চারটি পক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার, প্রশাসনসহ পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। এখানে গ্যাপ পূরণ করতে সমঝোতামূলক পদক্ষেপ নিতে বলেছি।

এর আগে শনিবার রাতে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠকে নির্বাচন, সংস্কার ও বিচার নিয়ে তিন দলই নিজেদের আগের অবস্থান তুলে ধরেছে।

বিএনপি বলেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে যে নির্বাচন হবে, সেই প্রতিশ্রুতি তারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে পায়নি। জামায়াত নির্বাচনের সঙ্গে সংস্কারের পথনকশা চাইলেও কোনো সময়ের কথা বলেনি। তবে তারা আগের মতোই নির্বাচনের আগে সংস্কারের ভাবনা জানিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে এনসিপি বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই ঘোষণাপত্রের বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জানিয়ে এসেছে। তারা বলেছে, আওয়ামী লীগের সময়ের সব নির্বাচন আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা প্রধান উপদেষ্টার এ উদ্যোগকে কয়েক দিন ধরে চলা অস্থিরতা প্রশমনের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, তাতে তিনি কিছুটা হলেও সফল হয়েছেন বলে তারা মনে করছেন। তবে জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে যে মতভিন্নতা রয়েছে, সেটা কাটিয়ে উঠতে তারা দ্রুত নির্বাচনের পথনকশার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। বলেছেন, তাহলে নতুন নতুন দাবি আসতেই থাকবে, যা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত