অস্তিত্বের লড়াইয়ের মধ্যেও আশার আলো

আপডেট : ২৬ মে ২০২৫, ০৭:৩৭ এএম

৭০ বছরের পুরনো বরিশালের আমানতগঞ্জে অবস্থিত সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারটি এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে। ১৯৫৪ সালে ১৮ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই খামার জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ২৪টি পদের মধ্যে ২০টি পদই শূন্য। আছে নিরাপত্তাহীনতা আর অবকাঠামোগত সংকট। এর মধ্যে খামার যে জমিতে তার মালিক জেলা প্রশাসন। ফলে প্রকল্প বা স্থাপনার জন্য একেক পক্ষ একেক সময় চেষ্টা করে। ফলে সৃষ্টি হয় প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব। খামারে সীমানা প্রাচীর না থাকায় রাতে-দিনে বসে মাদকের আড্ডা। তারপরও বাকি চার জন অদম্য ইচ্ছায় টিকিয়ে রেখেছেন খামারটি।

১৮ একর জমির ওপর ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারি খামারটির জমির মালিকানা আজও মুরগি প্রজনন ও খামার উন্নয়ন অধিদপ্তরের নামে হয়নি। এখনো এ বিশাল জায়গার নাম দলিলবদ্ধভাবে জেলা প্রশাসকের অধীনে। আবার যে ১৮ একরের ওপর খামারটি দাঁড়িয়ে, তার ১২ একরই দখল করে আছে বিশাল একটি দীঘি। খামারের কার্যক্রম চলে মাত্র ৬ একরের মধ্যে। তাতেও নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। নেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নাইট গার্ড বা সিকিউরিটি কর্মী নিয়োগই হয়নি বহু বছর।

২৪টি পদের বিপরীতে মাত্র ৪ জন কর্মী দিয়ে চলছে পুরো খামারের কার্যক্রম। শূন্যপদে নেই নিয়োগ, বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে একইভাবে। খামারের ১২টি শেডের মধ্যে ২টি একেবারেই পরিত্যক্ত, বাকিগুলোর অবস্থাও জরাজীর্ণ। মুরগির জন্য নির্ধারিত ঘরগুলোতে ছাউনি ফেটে বৃষ্টির পানি পড়ে, শুকনো মৌসুমে ধুলায় ভরে যায় পুরো পরিবেশ।

এমনকি কর্মকর্তা ও কর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থাও অপ্রতুল। পুরনো ভবনগুলো এখন ব্যবহারযোগ্য নয়, তবুও মাস শেষে গুনতে হয় বাড়িভাড়া, সরকারি নিয়মের ঘরে।

তবে এই সীমাহীন সংকটের মাঝেও খামারে এখনো শ্বাস নিচ্ছে সম্ভাবনা। বর্তমানে খামারে রয়েছে ৭৬৬টি প্যারেন্টস মুরগি। জন্ম নিয়েছে ৭ হাজার ১২৭টি বাচ্চা, যাদের বয়স এখন গড়ে প্রায় ২০ দিন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পরিমাণেও চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেকে এসে ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে।

এ ছাড়াও ডিম উৎপাদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে ঘাটতি। খামারের সবগুলো প্যারেন্টস মুরগি থেকেও প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ ডিম উৎপাদন হচ্ছে। যেসব শেডে যন্ত্রপাতি ও পরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন, তা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন পড়ে আছে। ফলে মুরগির স্বাস্থ্য, বাচ্চার বৃদ্ধি, এমনকি খাদ্য মজুদের ক্ষেত্রেও জটিলতা বাড়ছে।

কর্র্তৃপক্ষ বলছে, যদি জরুরি ভিত্তিতে খামারের নিজস্ব মালিকানা নিশ্চিত করা যেত, জনবল নিয়োগ দেওয়া হতো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হতো; তবে এই খামারটি বরিশাল বিভাগেই নয়, দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান মুরগি প্রজনন কেন্দ্রে রূপ নিতে পারত। অথচ এখন এটি দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংস আর সম্ভাবনার মাঝখানে, এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে।

সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের উপপরিচালক ডা. সৈয়দ আলতাফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনবল নেই, অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। তবুও আমি চেষ্টা করছি। দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের স্বপ্ন বুকে নিয়ে, চার জন মানুষের কাঁধে ভর করে টিকে আছে বরিশালের মুরগি প্রজনন খামার। আর এই টিকে থাকাই প্রমাণ করে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বরিশালের এই ঐতিহ্যবাহী খামার মাথা তুলে দাঁড়াবে। তবে সেটা তখনই সম্ভব, যখন জমির মালিকানা হস্তান্তর, জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত