যুদ্ধ কি বারবার অনিবার্য?

আপডেট : ২৮ মে ২০২৫, ০২:৩২ এএম

এরিখ মারিয়া রেমার্কের বিখ্যাত উপন্যাস ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। যুদ্ধবিরোধী সেই উপন্যাসে বলা হয়েছে, জেনারেল এবং মন্ত্রীদের কয়েকজনকে যুদ্ধে নামিয়ে দিলেই আর সৈন্য সামন্তদের যুদ্ধ করার প্রয়োজনটা ফুরিয়ে যায়। মোটকথা, যুদ্ধের যারা মাস্টারমাইন্ড তাদের যদি নিজেদের মধ্যে একটা সমাধান টানতে বলা হয়, তাহলেই হয়তো নৃশংস ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যেত। ‘রাজায় রাজায় লড়াই হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’ বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদটাও এর সত্যায়ন করে। তারপরও যুদ্ধবাজদের মতলববাজি এড়ানো দুষ্কর। তারা জনগণের আবেগকে উসকে দিয়ে নিজের ফায়দা লুটতে ব্যস্ত। ব্যালট বিপ্লবের জন্য কিংবা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য যুদ্ধটা তাদের বড় বেশি প্রয়োজন। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কি এটাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল? গত ২২ এপ্রিল ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ওই হামলায় পাকিস্তানের মদদ ছিল বলে অভিযোগ করে ভারত। নয়াদিল্লির এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইসলামাবাদ। এমন উত্তেজনার মধ্যে ৭ মে থেকে টানা চার দিন পাল্টাপাল্টি সংঘাতে জড়ায় দুই দেশ। ভারত এ অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন সিঁদুর’ আর পাকিস্তান নাম দেয় ‘বুনইয়ানুম মারসুস’। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ মে বিকেল থেকে শুরু হয় যুদ্ধবিরতি। 

ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, যুদ্ধবিরতিতে ভারত- পাকিস্তান একটি সাংস্কৃতিক শীতল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তেও যুদ্ধ, সন্ত্রাসী হামলা এবং কূটনৈতিক ভাঙনের মধ্য দিয়েও শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা দেশ দুটিকে সংযুক্ত রাখার চেষ্টা করেছিলেন। মুম্বাইয়ের নাটক করাচিতে দর্শকদের খুঁজে পেয়েছিল। লাহোরের চিত্রশিল্পীরা নয়াদিল্লিতে শো করেছিলেন। কর্মীরা বিতর্কিত সীমান্ত পেরিয়ে হেঁটেছিলেন, বিস্তৃত মহড়ায় সৈন্যদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন বিভাজনগুলোর মধ্যে একটি সেতুবন্ধ সৃষ্টির আশায়। ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা বাণী সিং বলেন, ‘‘যখনই দেশগুলোর মধ্যে ‘সম্ভাবনার’ ঝলক দেখা দিয়েছে, তখনই সহিংসতার কারণে তা ভেঙে পড়েছে। অবিশ্বাসের চক্র নতুন করে তৈরি হয়েছে।’’ নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে ভারতের অভূতপূর্ব সাফল্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে ভারত ও পাকিস্তানের তীব্র সামরিক সংঘর্ষের সময় এবং তার পরের দিনগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর তথ্য অপ্রতিরোধ্য ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে চালিত মিথ্যা, অর্ধসত্য, মিম, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ফুটেজ এবং বক্তৃতার কারণে সীমান্তের উভয় পাশেই কাল্পনিক তথ্য থেকে সত্য আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইন্ডিয়া টুডে টেলিভিশন চ্যানেলের উপস্থাপক রাজদীপ সরদেশাই গত সপ্তাহে পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত করার খবর প্রচারের জন্য দর্শকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

চীন জয়ী : যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তান সম্ভবত চীনের তৈরি জে-১০ বিমান ব্যবহার করে ভারতীয় যুদ্ধবিমানের ওপর আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। সক্রিয় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চীনা অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করার পর পাকিস্তানের বিজয় দাবিকে কিছু বিশেষজ্ঞ বেইজিংয়ের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য উৎসাহ হিসেবে দেখছেন, তবে কেউ কেউ এই দাবির সঙ্গে একমত নন। কিছু বিশেষজ্ঞ এটিকে চীনা অস্ত্র শিল্পের জন্য একটি ‘ডিপসিক মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন, এই বছরের জানুয়ারিতে যখন চীনা এআই স্টার্ট-আপ তার সাশ্রয়ী প্রযুক্তি দিয়ে মার্কিন জায়ান্টদের নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই আকাশযুদ্ধ চীনা অস্ত্র শিল্পের জন্য একটি বড় বিজ্ঞাপন ছিল। এখন পর্যন্ত, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চীনের প্ল্যাটফর্ম পরীক্ষা করার কোনো সুযোগ ছিল না। বেইজিংভিত্তিক বিশ্লেষক বলেছেন, আকাশ যুদ্ধের ফলাফল দেখায় যে, ‘চীনের এমন কিছু সিস্টেম রয়েছে যা অতুলনীয়’।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ভাবমূর্তি বৃদ্ধি : দেশটির মন্ত্রিসভা সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে পদোন্নতি দিয়েছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ১৯৫৯ সালে, দেশটি কেবল একবারই ফিল্ড মার্শালের পাঁচ তারকা পদমর্যাদা প্রদান করেছে জেনারেল আইয়ুব খানকে। যিনি ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের একনায়ক হিসেবে নিজেকে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। আসিম মুনির দেশটির দ্বিতীয় ফিল্ড মার্শাল।

যুদ্ধ কি ফিরে আসা অনিবার্য? : ১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালে ভারতের সঙ্গে বারবার যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় ভূমিকা তৈরি হয়েছে মূলত কাশ্মীর নিয়ে, যেটিকে উভয় দেশই সম্পূর্ণরূপে দাবি করে শুধুমাত্র কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে দেখা যায়, চার দিনের আন্তঃসীমান্ত ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর উভয় পক্ষের মধ্যে প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে উন্নত সংঘর্ষে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই বিজয় দাবি করলেও, কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন যে শত্রুতার প্রত্যাবর্তন প্রায় অনিবার্য। এরই মধ্যে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে স্কুলবাসে ভয়াবহ বোমা হামলায় অন্তত ৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যার মধ্যে ৬ জনই শিশু। এ ঘটনার পর ভারত-পাকিস্তান ফের উত্তেজনার মুখে পড়েছে। দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। গত ২১ মে সকালে খুজদারে ঘটে যাওয়া হামলায় আহত হয়েছে বহু শিশু। ঘটনাস্থলের বিভীষিকাময় চিত্র, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্কুলব্যাগ, রক্তাক্ত জুতা এবং ধ্বংসাবশেষ আঘাত করে মানবিক অনুভূতিতে। এই হামলা শুধু পাকিস্তান নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এবার এই হামলায় ভারতের ‘প্রক্সি গোষ্ঠীর’ জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে পাকিস্তান। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষই হামলার দায় স্বীকার করেনি। ভারত সরকারও এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। এর ফলে সামনে ফের একটা মুখোমুখি সংঘাতের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। দুই দেশের আকাশে যুদ্ধের অত্যাধুনিক ড্রোন ওড়ার চেয়ে শান্তির পায়রা উড়ুক এ প্রত্যাশাই থাকবে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত