পরিবেশদূষণ প্রতিকারে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা

আপডেট : ২৯ মে ২০২৫, ১২:৩৮ এএম

পরিবেশদূষণের দিক থেকে প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক। সম্প্রতি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ঢাকা শহরকে দূষণের কারণে বসবাসের জন্য অযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পরিবেশ এবং এর গুণগত অবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয় বিভিন্ন বিষয় দ্বারা, তার মধ্যে অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন ঘটানো,  নদী-নালা, খাল-বিলগুলো দখল এবং এর গতিপথ পরিবর্তন করা, প্রাকৃতিক বনভূমি বিনষ্ট করা, কৃষিকাজ ও মৎস্য উৎপাদনের নামে মাটি ও পানি দূষিত করা, শিল্প কলকারখানার বর্জ্য প্রকৃতির মাঝে পরিশুদ্ধ না করে ছড়িয়ে দেওয়া, প্রাকৃতিক সম্পদ যথাযথভাবে আহরণ এবং ব্যবহার করতে ব্যর্থ হওয়া, শহর ও নগর অঞ্চল অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা, গৃহস্থালী এবং মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকা অথবা মানসম্মত না হওয়া, রাস্তাঘাটগুলোর গুণগতমান এবং সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার বেহাল দশা। এর বাইরে রয়েছে  দেশের নাগরিকদের পরিবেশসংক্রান্ত শিক্ষা এবং সচেতনতার বিষয় জ্ঞানের স্বল্পতা, পরিবেশের রক্ষা আইনের প্রয়োগ অথবা মেনে না চলা এবং সর্বোপরি সাংস্কৃতিকভাবে জনগণের মাঝে এবং সরকারি পর্যায়ে এর তাৎপর্য বা গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়া। বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি এবং পরিবেশ ধ্বংসের জন্য উল্লিখিত কারণগুলোর প্রায় সব কারণই কোনো না কোনোভাবে এর জন্য দায়ী।

আমরা যদি ঢাকা এবং ঢাকার আশপাশের অঞ্চলগুলোকে বিবেচনায় নিই তাহলে সহজেই বোঝা যাবে, আমাদের কর্মকান্ডের কারণে পরিবেশের ওপর কী ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে। একটি জনপদের প্রকৃতি এবং মানুষ কেমন আছে তা সহজেই বোঝা যাবে ওই অঞ্চলের নদী-নালা খাল-বিলের পানির অবস্থা এবং বায়ুমণ্ডলের অবস্থা  পর্যবেক্ষণ করলে। ঢাকা শহরের আশপাশে যেসব নদ-নদী অথবা জলাভূমি আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বংশী নদীসহ বেশ কিছু নিম্ন জলাভূমি। বছরের অধিকাংশ সময় কলকারখানা এবং মিউনিসিপ্যালিটির ড্রেন থেকে নির্গত বর্জ্যপানির কারণে এ সব জলাভূমির পানির রঙ থাকে কালো এবং দুর্গন্ধযুক্ত। সঙ্গতকারণেই মানুষ এসব জলাভূমির পানি দৈনন্দিন জীবনে যেমন ব্যবহার করতে পারে না, ঠিক তেমনি দুর্গন্ধের কারণে এর আশপাশে বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে। পানির গুণগতমান এতটাই খারাপ যে, এর মধ্যে যে সব জলজ প্রাণী বসবাস করার কথা ছিল তারাও বসবাস করতে পারে না। একটি নদীর স্বাভাবিক যে বৈশিষ্ট্য থাকার কথা সেটি হারিয়ে ফেলে একটি মৃত নদীতে পরিণত হয়, আর এরই প্রভাবে নদী এবং জলাভূমির আশপাশের জনপদ বাস্তবিক অর্থে মৃত জনপদে রূপান্তরিত হয়েছে। এক সময় এসব নদী এবং খাল-বিল থেকে নদীনির্ভর সম্পদ আহরণ করে জীবন-জীবিকা যারা রচনা করত তারা আজ নির্বাসিত হয়েছে। অন্যদিকে এসব অঞ্চলের আশপাশে যে নগর গড়ে উঠছে সেটিও পরিবেশের বিরূপ প্রভাবের ফলে বসবাসের অনুপোযোগী স্থানে রূপান্তরিত হচ্ছে। অপরদিকে প্রায়ই ঢাকা শহর বায়ুদূষণের তালিকায় বিশে^র এক নম্বর দূষিত নগরীরূপে চিহ্নিত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ঢাকার আশপাশে অসংখ্য ইটের ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এবং বিষাক্ত গ্যাস। শব্দদূষণের ক্ষেত্রেও আমাদের প্রতিটি নগর ও শিল্পাঞ্চল অন্যতম দূষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, এর জন্য প্রধানত দায়ী রাস্তায় মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি চালানো, অপরিকল্পিত কনস্ট্রাকশনের কাজ, উচ্চ শব্দে গাড়ির ভেঁপু ও মাইক বাজানোসহ নিম্নমানের রাস্তাঘাট। আমাদের দেশ কৃষিনির্ভর দেশ, সংগতকারণেই কৃষি ক্ষেত্রেও অধিক ফলনের আশায় অপরিমিত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে মাটি ও পানি দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এর কারণে মৎস্য সম্পদসহ বিভিন্ন ধরনের বন্য প্রাণী এবং পাখি ক্রমাগতভাবে তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় হুমকির মুখে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন না করায় মাটি, পানি ও বাতাস নানা ধরনের দূষিত পদার্থ দ্বারা ভারাক্রান্ত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন ধরনের দূষিত পদার্থ আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে পড়ছে, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাইক্রো প্লাস্টিক, ক্রোমিয়াম, মার্কারি এবং মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক। পরিবেশের এই দূষণের কারণে জনস্বাস্থ্য চরমভাবে ঝুঁকিতে পড়ছে এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রতিটি মানুষের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং পরিবেশের দূষণের ফলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিক অর্থনৈতিক অবস্থারও অবনতি ঘটছে।

পরিবেশের গুণগতমান ঠিক রাখার ক্ষেত্রে যেমন ব্যক্তি সচেতনতার প্রয়োজন ঠিক তেমনি আইনের প্রয়োগও একান্ত দরকার। অথচ যেসব প্রতিষ্ঠান এই বিষয়ে পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের যথেষ্ট রকমের উদাসীনতা এবং একাজে অবহেলা পরিবেশদূষণকে আরও বেশি জটিল করে তুলছে। আমি মনে করি, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা একান্ত প্রয়োজন।  কারণ রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের নিজেদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে পারে, তবে দেশ পরিচালনার সময় ওইসব রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সুতরাং পরিবেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা একান্ত কাম্য।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে, তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে জনগণের মাঝে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিরূপে প্রকাশ করা দরকার। এর মধ্যে দিয়ে নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে দেশ পরিচালনার সময় পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাধ্য থাকবে।

লেখক : সভাপতি, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ

         জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত