মানুষের সক্ষমতার সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে কোরবানির পশু বিক্রির সংখ্যা। চাহিদার সঙ্গে বড় হয়েছে এ বাজার। গত কোরবানি ঈদে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার পশু বিক্রি হয়েছিল। তবে এবার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক টানাপড়েনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে এ বাজার খানিকটা সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা করেছেন পশুপালনের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, মানুষের সীমিত আয়ের সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি একশ্রেণির মানুষকে পশু কোরবানি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। আবার যেসব মানুষ বেশি ব্যয় করে কোরবানির পশু কিনত সেটা এবার কমিয়ে ফেলতে পারে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত সরকারের অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি পলাতক ও আত্মগোপনে থাকায় কোরবানি পশু কিনবেন না। ফলে সেই প্রভাব পড়বে বাজারে। তবে নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির মতো দলগুলোর নেতৃস্থানীয়রা সেই গ্যাপ পূরণে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, গত বছর ১ কোটি ৪ লাখের বেশি পশু কোরবানি হয়েছে, যেখানে ১ কোটি ২৯ লাখের বেশি পশুর সরবরাহ ছিল। এ বছর ১ কোটি ২৪ লাখ কোরবানির পশুর সরবরাহ রয়েছে। তবে কোরবানি পশুর সংখ্যা গত বছরের চেয়ে কম হওয়ার ধারণা করছেন উদ্যোক্তারা।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, গত বছর ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ৬৪ হাজার ৭২৩ কোটি, ২০২২ সালে ৬৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকার পশু কোরবানি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছে, দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরিতে স্থবিরতা, ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধারণ মানুষের আয় না বাড়ার একটা চাপ পড়তে পারে এবারের কোরবানিতে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবেশটা অস্থির, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি। প্রতি বছর ইফেকটিভ চাহিদা হিসেবে ৫ শতাংশ পর্যন্ত পশুর বাড়তি চাহিদা হিসেবে করা হয়, এবারে হয়তো সেটা নাও বাড়তে পারে। আর্থিক চাপের কারণে অনেকেই হয়তো মাঝারি-ছোট গরুতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। গত বছর অনেক পশু উদ্বৃত্ত ছিল।
তিনি বলেন, খাদ্য, কর্মচারীর বাড়তি খরচ এবং বাড়তি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের কারণে পশুপালনের সামগ্রিক খরচ এবারও বাড়তি থাকবে। যে কারণে কোরবানির পশুর দাম স্বাভাবিকভাবেই একটু বাড়বে, তবে খামারি বা পশুপালকরা যদি অতিরিক্ত দাম নির্ধারণ করেন, সেটা হিতে বিপরীত হতে পারে। এবার তারা যদি পশুপালন ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে অল্প লাভে পশু বিক্রি করেন, সেটা বাজারের জন্য ইফেকটিভ হবে।
খামারিরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয়ের কারণে প্রতি বছর পশুপালনে খরচ বৃদ্ধি পায়। যার একটা প্রভাব বাজারে থাকে। তবে যেসব পরিবারে দুই-পাঁচটি গরু পালন করা হয় তারা দামটা একটু বেশি লাভের আশা করেন। এটাও বাজারে একটা প্রভাব রাখে। গত বছর ঢাকার বাজারে লাইভ ওয়েট হিসেবে বিভিন্ন আকারের গরু বিক্রি হয়েছে ৪৮০-৫৫০ টাকা কেজি দরে। গত বছর ঢাকার বাজারে গরু বিক্রি করতে আসা খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আকারের গরু বিক্রি হয়েছে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে। অনেক ছোট আকারের গরুই কিনতে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজারের মধ্যে। সেটা এবার হয়তো আরও একটু বেশি দামে বিক্রি হবে।
বাংলাদেশে কয়েক লাখ খামারি রয়েছেন, যারা এখন বাণিজ্যিকভাবে পশুর খামার পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে হাজার পাঁচেক খামারি রয়েছেন যারা ৪০-৫০ বা তারও বেশি পরিমাণে গরু পালন করছেন। এর বাইরে দুই-পাঁচটি গরু পালন করেন সারা দেশের এমন গৃহস্থ পরিবারগুলো থেকেই কোরবানির বাজারে ৭০ ভাগ পশু আসে।
বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও চট্টগ্রামের ডেইরি খামারি মালিক ওমর দেশ রূপান্তরকে বলেন, উৎপাদন ব্যয়ের কারণে স্বাভাবিকভাবেই পশুপালন খরচ এখন বেশি, যদিও গত এক মাসে ফিডের দাম খানিকটা কমেছে। তবে কর্মচারীর ব্যয়, বিদ্যুৎ, পরিবহন সব খরচই বেশি। যেটা গরুর দামে প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কোরবানিতে যতটা প্রভাব ফেলবে, তার চেয়ে অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি চাপ তৈরি করবে। তবে কোরবানির পরিমাণ সামগ্রিকভাবে খুব বেশি কমবে বলে মনে হয় না। হয়তো অনেক বড় গরুর চাহিদা কম থাকবে, কিন্তু ছোট ও মাঝারি গরুর বিক্রি বেড়ে যেতে পারে।
গত বছর ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি পশু কোরবানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ১০৬টি বেশি ছিল। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত বছর কোরবানি হওয়া পশুর মধ্যে ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৯টি গরু, ১ লাখ ১২ হাজার ৯১৮টি মহিষ, ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ৭১৯টি ছাগল, ৪ লাখ ৭১ হাজার ১৪৯টি ভেড়া এবং ১ হাজার ২৭৩টি অন্যান্য পশু ছিল।
এ বছরও চাহিদার বেশি পরিমাণে কোরবানির পশুর সরবরাহ থাকলেও বিদেশ থেকে এখনো গরু পাচার হয়ে আসছে বলে দাবি করেন খামারিরা। তারা বলছেন, নানা কারণে ভারত থেকে গরু আসার পরিমাণ সীমিত হলেও এ বছর মিয়ানমার থেকে অনেক গরু দেশে প্রবেশ করছে। যদিও মাসখানেক আগে এক সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার দিয়ে মিয়ানমার থেকে গরু আসার কথা স্বীকার করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ফরিদা আখতার। ওই সময় তিনি গরু আসা বন্ধের জোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এদিকে গ্রামাঞ্চলে কোরবানির পশু বিক্রি শুরু হলেও ঢাকায় এখনো হাটের কার্যক্রম শুরু হয়নি। চলছে প্রস্তুতি। গরুর হাট এলাকায় থাকবে সান্ধ্যকালীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের গরুর হাটসংলগ্ন এলাকায় সান্ধ্যকালীন ব্যাংকিং চালু রাখার এ নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়, ঈদের আগে কোরবানির পশুর হাটে বিপুলসংখ্যক ক্রেতা ও বিক্রেতার সমাগম হয় এবং সেখানে প্রচুর নগদ লেনদেন ঘটে। এ পরিস্থিতিতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু লেনদেন নিশ্চিত করতে হাটের নিকটবর্তী ব্যাংক শাখা ও উপশাখাগুলোকে সান্ধ্যকালীন ব্যাংকিং চালু রাখতে হবে। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এ ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু থাকবে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে এবারে পশুর হাট বসবে ১৯টি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৯টি এবং উত্তর সিটির ১০টি স্থানে পশুর হাট বসবে। ঈদের আগের তিন দিনসহ পাঁচ দিন চলবে পশু বেচাকেনা। এবারে আফতাবনগর ও মেরাদিয়া পশুর হাট বাদ পড়েছে।
ফ্রিজ, মসলা, মিষ্টি-পানীয়র বাজার জমজমাট হওয়া আশা : কোরবানি ঈদ কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে পশুর বাজারের বাইরেও বেশ কিছু পণ্যের বাড়তি বেচাকেনা লক্ষ করা যায়। এর একটি হচ্ছে ফ্রিজ। কোরবানির ঈদ ঘিরে জমজমাট থাকে ফ্রিজের বাজার। বাংলাদেশ ফ্রিজের বাজার এখন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। তবে একটা নির্দিষ্ট সময়ের হিসাব করলে এই পণ্যটির সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয় কোরবানির ঈদ সামনে রেখে। ফ্রিজ তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ব্র্যান্ড সারা বছর বিক্রির পাশাপাশি বড় সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করে এ সময়কে লক্ষ্য করে।
ইলেকট্রনিকস পণ্যের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সারা বছর যে পরিমাণ ফ্রিজ বিক্রি হয়, তার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক। অর্থাৎ ঈদ কেন্দ্র করেই প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের ফ্রিজ উৎপাদন ও বিক্রি হয়।
এ সময়টাতে গুরুত্ব কম পোশাকে, চাহিদা বাড়ে মসলায়। রোজার ঈদের উদযাপন নতুন পোশাক ছাড়া চিন্তাই করা যায় না। তবে নতুন পোশাকের এই ক্রেজ একেবারেই তলানিতে নেমে আসে কোরবানির ঈদে। রোজার ঈদের আগের রাত পর্যন্ত শপিং মলগুলো মানুষে ভরা থাকলেও এ সময় পোশাকের দোকানগুলোতে ভিড় দেখা যায় না, যদিও অল্প পরিসরে পোশাকের বেচাবিক্রি থাকে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
তবে কোরবানিতে ব্যাপক কেনাবেচা করতে দেখা যায় নানা পদের মসলা। কোরবানির মাংসের রান্না মুখরোচক করতে সামর্থ্য অনুযায়ী সীমিত আয়ের মানুষও মসলা কেনে। এতেই বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। পেঁয়াজ, রসুন আদার মতো নিয়মিত ব্যবহৃত মসলাগুলোর চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এলাচি, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতাসহ বিভিন্ন মসলার কদর বেড়ে যায়।
কোরবানি ঈদেই এসব পণ্যে অন্তত মসলা, পোশাক মিলিয়ে আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে জানান খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে ঈদে চাহিদার শীর্ষে থাকে মিষ্টান্ন, কোমল পানীয়র। ঈদের দিনে সেমাই, পায়েস, নানা পদের পিঠা বাসাবাড়িতে রান্না হলেও ঘরে ঘরে সামর্থ্য অনুযায়ী দই-মিষ্টি খাওয়ার একটা প্রচলন রয়েছে। বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদের দই-মিষ্টির দোকানগুলোতে ভিড় লেগেই থাকে। ঈদকেন্দ্রিক তিন দিন মিষ্টির দোকানগুলোতে ভিড় লেগেই থাকে।
মিষ্টান্নের বাজারে বর্তমানে শহরগুলোতে ব্র্যান্ডেড দোকানগুলোতে বাহারি পদের দই-মিষ্টি থাকলেও এখনো এলাকাভিত্তিক দোকানগুলোর মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি দই-মিষ্টি বিক্রি হয়ে থাকে। সব মিলে এ বাজারটা ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যেখানে আবার শুধু নানা পদের দইয়ের বাজারই ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে বাংলাদেশ সুইট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য থেকে জানা গেছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি মিষ্টির দোকান রয়েছে, যেখানে ২০ হাজারের মতো রয়েছে নন-ব্র্যান্ডেড। এ বাজারটার সঙ্গে অবশ্য সরাসরি জড়িত আবার দুধের বাজার। এ সময়টায় দই-মিষ্টির দোকানগুলোতে দুধের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয় এবং দুগ্ধ খামারিরা ভালো দামে দুধ বিক্রি করতে পারেন।
এ ছাড়া কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে একটা বড় বাজার রয়েছে কোমল পানীয়র। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক এ সময়টাতে ৩০ শতাংশ বাড়তি গ্রোথ আসে বেভারেজের বাজারে।
পাশাপাশি ৪ হাজার কোটি টাকার কোরবানির পশুর চামড়ার যে ব্যবসা, সেটাকে আবারও ঠিক করতে সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং চামড়ার সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দিয়েছে।