চার মাসেই দম ফুরাল মাস্কের!

আপডেট : ৩১ মে ২০২৫, ০৪:৪৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সবশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকে দুই ধনকুবেরের ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্কের মেলবন্ধন ছিল আলোচিত বিষয়। তবে সেই বাঁধন যে একটু একটু করে আলগা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। আর এবার তো বিচ্ছেদের সুরই বেজে উঠল। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মাস্ক নিজেই। যদিও বিশেষ সরকারি উপদেষ্টা হিসেবে তার মেয়াদ প্রায় শেষের দিকেই ছিল। তবে চার মাসের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালন করা মাস্ক তার কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনে তার প্রভাব ও সরকারি দক্ষতা বিভাগের (ডিওজিই) দায়িত্ব তার প্রযুক্তি ব্যবসাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই মাস্কের এই সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার পর তার নেওয়া সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের বিষয়ে অনুমিতভাবেই কাটাছেঁড়া চলছে।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাস্ক জানান, সরকারি বিশেষ কর্মকর্তা হিসেবে আমার নির্ধারিত সময় শেষ হচ্ছে। অপচয়মূলক ব্যয় কমাতে সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। ট্রাম্প এই বছরের শুরুতে হোয়াইট হাউজে ফিরেই সরকারি ব্যয় কমানোর ঘোষণা দিয়ে ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (ডিইওজি)’ বিভাগ খুলে তার দায়িত্ব দেন মাস্ককে। ডিইওজি বিভাগের দায়িত্ব পেয়েই বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মী ছাঁটাইয়ের পদক্ষেপ নেন মাস্ক। তার পরামর্শে ইউএসএআইডির মতো সংস্থার আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অতল অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ডিইওজি ফেডারেল সরকারের ২৩ লাখ কর্মী থেকে ১২ শতাংশ বা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার জনকে ছাঁটাই করেছে। একপর্যায়ে মাস্কের এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবশালী কয়েকজনের সঙ্গেও মতবিরোধ দেখা দেয় মাস্কের। গত মঙ্গলবার ইলন মাস্ক কংগ্রেসে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের কর ও বাজেট-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের বিষগুলো নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচিত এই কর ও ব্যয়-সংক্রান্ত বাজেট বিল নিয়ে মতবিরোধের জেরেই নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

স্পেসএক্স ও বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। এ বিলটি গত ২২ মে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেট থেকে কমপক্ষে ১ ট্রিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ডিওজিইর ওয়েবসাইটের তথ্য দেখাচ্ছে, সাশ্রয় করা গেছে মাত্র ১৭৫ বিলিয়ন ডলার। ট্রাম্প ভোটের আগে-পরে মাস্ককে উচ্চ প্রশংসায় ভাসালেও সম্প্রতি দুজনের সস্পর্কে আগের উষ্ণতা না থাকার বিষয়টি আঁচ করা যাচ্ছিল। ট্রাম্প সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেলেও তার প্রশাসনের অনেকের সঙ্গেই মাস্কের বনিবনা হচ্ছিল না, যার মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। পলিটিকো জানিয়েছে, হোয়াইট হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের পর মাস্কের বিদায়ের বিষয়টি এপ্রিল থেকেই আলোচনায় ছিল। ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের এপ্রিলের একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মাস্কের কাজের প্রতি সমর্থন মাত্র ৩৫ শতাংশের। নিজে বিদায় নিলেও মাস্ক আশা প্রকাশ করেছেন, ডিওজিই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও শক্তিশালী হবে।

মাস্কের আলোচিত বিষয়গুলো

নাৎসি স্যালুট : ২০ জানুয়ারির ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানের মঞ্চে মাস্ক দাঁড়িয়ে দুবার হাত সোজা করে এমন ভঙ্গিতে স্যালুট করেন, যা অনেক ইতিহাসবিদ ও ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদ ‘নাৎসি স্যালুট’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। মাস্কের সেই ভঙ্গিমার অর্থ যা-ই হোক না কেন, ট্রাম্পের বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফেরার দিনটি ঘিরে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ায় নাৎসি-সম্পর্কিত ঠাট্টা-তামাশাই ছড়িয়ে পড়েছে সবচেয়ে বেশি।

চরম-ডানপন্থি দলকে সমর্থন : ‘নাৎসি স্যালুট’ নিয়ে বিতর্কের পরই মাস্ক জার্মানির উগ্র-জাতীয়তাবাদী, অভিবাসনবিরোধী এএফডি দলের একটি সমাবেশে ভার্চুয়াল মাধ্যমে অংশ নেন। মাস্ক সেখানে এএফডির সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারাই জার্মানির শেষ ভরসা। দলটির সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জার্মান সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ নিয়ে গর্বিত হোন। এএফডির প্রতি মাস্কের প্রকাশ্য সমর্থন জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে। তারা বলেন, ট্রাম্পের উপদেষ্টার এমন আচরণকে তারা বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

হোয়াইট হাউজে ছেলেকে নিয়ে আসা : মাস্ক প্রায়ই হোয়াইট হাউজে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ) টি-শার্ট পরে হাজির হতেন। একসময় তার চার বছরের ছেলে এক্স-ও নিয়মিত সেখানে আসত। সরকারের দক্ষতা বৃদ্ধি-সংক্রান্ত ডিওজিই পরিচালনার জন্য ওয়াশিংটনে আসার পর মাস্ক প্রথমবার যখন সাংবাদিকদের সামনে আসেন, তখন তার ছেলেকেও সামনে আনা হয়। সেখানে ট্রাম্প বলেন, সে হচ্ছে এক্স, আর সে দারুণ ছেলে। এ ঘটনাও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিদের মধ্যে মাস্কের বিষয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

বাজেটে চেইন-করাত : সিনেটে অননুমোদিত এবং সরাসরি নির্বাচিত না হলেও মাস্ক বারবার আমলাতন্ত্রকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনির্বাচিত, অসাংবিধানিক চতুর্থ শাখা’ বলে আক্রমণ করেন। তিনি খুব দ্রুতই ফেডারেল জনবল ও বাজেটে ব্যাপক কাটছাঁট শুরু করেন। নিজের ব্যবস্থাপনার ধরন বোঝাতে মাস্ক ওয়াশিংটনের এক রক্ষণশীল সমাবেশে সানগ্লাস পরে মঞ্চে ওঠেন। সেখানে হাতে তুলে নেন একটি চেইন করাত। এই চেইন করাত মাস্ককে দেন ডানপন্থি আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই, যিনি নিজ দেশে আমলাতন্ত্র ও সরকারি খরচ কমানোর প্রতীক হিসেবে এই যন্ত্র ব্যবহার করেন।

ট্রাম্পের মন্ত্রিসভাকে ছাপিয়ে যাওয়া : মন্ত্রিসভার সদস্য না হলেও ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক মাস্ককে কতৃত্ববাদী করে তোলে। তিনি দেশ জুড়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ছাপিয়ে যান। তবে এসব উত্তেজনাকে গুরুত্ব না দিয়ে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন, মন্ত্রিসভার সব সদস্যই ইলনের সঙ্গে দারুণ খুশি। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা মাস্ককে আর রাজনীতিতে দেখতে চাইছেন না।

উইসকনসিনে হার : উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনে একজন ট্রাম্পপন্থি বিচারককে জেতাতে মাস্ক ২ কোটি ৫০ লাখ খরচ করেন। রক্ষণশীল বিচারককে জয়ী করতে ভোটারদের ১০০ ডলার করে দেন ইলন মাস্ক। এমনকি ভোটারদের ১০ লাখ ডলারের চেকও দেন তিনি। মাস্কের এত অর্থ ব্যয়ের পরও উদারপন্থি এক বিচারক বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন। ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে জেতাতে মাস্ক মোট ২৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করেন।

শুল্কবিরোধী মাস্ক : ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে, তখন ইলন মাস্ক এই শুল্কের বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে একটি ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ গঠনের প্রস্তাব দেন।

মাস্কের এই প্রস্তাব সরাসরি ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিছুদিন পর মাস্ক ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পিটার নাভারোকে আক্রমণ করে বলেন, তার মাথায় বুদ্ধি কম। নাভারো তখন টেসলার সমালোচনা করে বলেন, কোম্পানিটি মূলত এশিয়ার কারখানা থেকে যন্ত্রাংশ এনে গাড়ি তৈরি করে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট এই প্রকাশ্য বিবাদের গুরুত্ব কমিয়ে বলেন, ছেলেরা তো ছেলেই! তাদের মধ্যে এ রকম একটু-আধটু হয়েই থাকে।

‘বিগ, বিউটিফুল বিল’ নিয়ে বিরোধ : মাস্ক বলেছেন, ট্রাম্পের বিরোধপূর্ণ বড় ধরনের খরচ কমানোর বিল দেখে তিনি খুবই হতাশ হয়েছেন। এটা একটা বিরল ঘটনা, যেখানে তিনি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একমত নন।

গত সপ্তাহে ট্রাম্পের আলোচিত এই ‘ওয়ান বিগ, বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ বিলটি পাস হয়েছে। বিলটি এখন সিনেটে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে সিবিএস নিউজকে ইলন মাস্ক বলেন, ব্যয়বহুল বিলটি দেখে আমি হতাশ হয়েছি। সত্যি বলতে, এটা বাজেট ঘাটতি কমানোর বদলে বরং আরও বাড়াবে। সেই সঙ্গে ডোজের কাজের অবমূল্যায়ন করবে। সমালোচকরা সতর্ক করেছেন, এই আইন স্বাস্থ্যসেবা কমিয়ে দেবে এবং ১০ বছরের মধ্যে জাতীয় ঘাটতি ৪ লাখ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবে। এর পরেই মাস্ক ঘোষণা করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পদ থেকে পদত্যাগ করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত