জনমত কোন দিকে যাচ্ছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা না করে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে আটক বা গ্রেপ্তারের পথে যাবে না অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারি একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, যদিও আবদুল হামিদের ওপর স্বৈরাচারের ফ্যাসিস্ট তকমা রয়েছে, তবু দেশ জুড়ে তিনি একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ধরে রেখেছেন। এ কারণে তাকে আটক বা গ্রেপ্তারের বিষয়ে সরকার সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। অন্যথায়, এমন কোনো পদক্ষেপের ফলে বিপরীতমুখী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সরকার আশঙ্কা করছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, আবদুল হামিদ বর্তমানে রোগাক্রান্ত এবং বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এ বিষয়গুলো সরকারকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। অন্য একটি সূত্র দাবি করেছে, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এটিও সরকারকে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। ফলে আবদুল হামিদকে আটক বা গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা বর্তমানে কম বলে জানা গেছে।
গত ৭ মে চিকিৎসার জন্য আবদুল হামিদকে বিদেশে যেতে হয়। এ ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে ব্যাপক আলোচনা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু দেশে ফিরে আসার পর সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। তবে এ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। আবদুল হামিদের দেশে ফেরার পর প্রায় প্রতিদিনই সরকারের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবদুল হামিদের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে যেভাবে হইচই করা হয়েছে, তা ছিল অপ্রত্যাশিত। চিকিৎসাসেবা পাওয়া একজন মানুষের মৌলিক অধিকার।’ তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি দেশে ফিরে আসার পর সবাই কেন নীরব হয়ে গেছে!’
আবদুল হামিদের দেশত্যাগের বিষয়টি আওয়ামী লীগবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী নানাভাবে সমালোচনা করেছে। এ ইস্যুটি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’র অভিযোগ এনে দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে রূপ নেয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী ছাত্রশিবির, ইসলামী আন্দোলন, ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন এ ইস্যুতে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিকিৎসা শেষে সাবেক রাষ্ট্রপতির দেশে ফেরা সরকারকে কিছুটা বিস্মিত করেছে। কারণ, যাকে কেন্দ্র করে এত হইচই ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার দেশে ফিরে আসা অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাশা করেনি। এ ছাড়া কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সেক্টরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, নানা বক্তব্য-বিবৃতি এবং উদ্যোগ সরকারকে কিছুটা বিব্রত করেছে।
অন্য একটি সরকারি সূত্র জানায়, আবদুল হামিদের দেশে ফেরা ছিল ধারণার বাইরে। তার ফিরে আসা আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের তৎপরতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সে সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে তাকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ধরে আনা হবে।’
একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি, যিনি কিশোরগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি, তিনি কীভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে দেশ ত্যাগ করলেন? কেন তাকে আটক করা হলো না? সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এই প্রশ্নগুলো উঠতে শুরু করে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এমনকি বলেছিলেন, দোষীদের শাস্তির আওতায় না আনা গেলে তিনি নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে যাবেন। আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনা তদন্তে সরকার উপদেষ্টা পরিষদের তিন সদস্যের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে এক মাসের চিকিৎসা শেষে গত রবিবার রাতে আবদুল হামিদ দেশে ফিরে আসেন। এ চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া এবং ফেরা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যদিও তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়েছিলেন বলে জানানো হয়, তবু এটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে দেশের রাজনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও বিক্ষোভ শুরু হয়। তার পরিবার জানিয়েছে, আবদুল হামিদ ফুসফুসের টিউমার এবং কিডনির জটিলতায় ভুগছেন। এ ছাড়া তার আরও কিছু শারীরিক সমস্যা রয়েছে। এসব চিকিৎসার জন্য তিনি থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন।
আবদুল হামিদের দেশে ফেরা নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকায় তাকে আটক করা হয়নি। তদন্তের পর যারা দোষী প্রমাণিত হবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’ গত সোমবার যাত্রাবাড়ী থানা পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে অনুরোধ করেছেন, আমি সেই অনুরোধ রাখছি। আমাদের তদন্ত করতে দিন। তদন্তে কেউ দোষী হলে তাকে আইনের আওতায় আনব। প্রমাণ না হলে কেন একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে শাস্তি দেব?’
আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, ‘এ ঘটনায় তিনজন উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের সুপারিশ পাওয়ার পর দোষী হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি দোষী না হন, তারা নিজ নিজ দায়িত্বে ফিরে আসবেন।’
আবদুল হামিদের দেশত্যাগ নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে, তখন তার কনিষ্ঠ ছেলে রিয়াদ আহমেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবার সাম্প্রতিক একটি ছবি পোস্ট করে আবেগঘন স্ট্যাটাস লেখেন। তিনি লিখেছেন, ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য ডাক্তাররা বোর্ড করে বিদেশে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যিনি রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষে প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি রাজনীতির সঙ্গে আর জড়াবেন না এবং রাজনীতির সঙ্গে কোনোভাবে জড়াননি। অথচ এ ঘটনাকে এত বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা কল্পনাতীত।’
কিশোরগঞ্জে গত বছর ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মিছিলে গুলিবর্ষণ, হামলা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদেরসহ ১২৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ১৪ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ সদর থানায় হওয়া এ মামলায় আবদুল হামিদের নামও রয়েছে।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেশত্যাগের বিষয়ে সরকার ও তাদের ঘনিষ্ঠমহল যে আচরণ দেখিয়েছে, তা অপরিপক্ব ও বিবেচনাহীন। তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়েছেন।’
আবদুল হামিদ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নবম জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গভবন ত্যাগের পর তিনি বর্তমানে ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকায় বসবাস করছেন।
আবদুল হামিদ বাংলাদেশের ১৭তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তার মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শপথ নেন।
