ক্রিকেট জগতে ব্যাটিং কিংবা বোলিং প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাধারণত খেলোয়াড়রা একটি হাতকেই প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তবে ক্রিকেটের এত বড় দুনিয়ায় কিছু দুর্লভ প্রতিভা আছেন, যারা বল হাতে দুই হাত থেকেই সমান দক্ষতায় প্রতিপক্ষকে চমকে দিতে পারেন। এদেরই বলা হয় ‘অ্যাম্বিডেক্সট্রাস’ অর্থাৎ দুহাতি বোলার। অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী এ বোলাররা ডানহাত এবং বাঁহাত দুদিক থেকেই বল করতে পারেন, যা তাদের দলকে এগিয়ে দেয় কৌশলগতভাবে। এ বহুমুখিতার ফলে ঘুরে যেতে পারে ম্যাচের মোড়, কেননা বিভিন্ন ধরনের পিচ কন্ডিশনের সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতাকে আরও কার্যকরভাবে লক্ষ্য বানানোর সুযোগ করে নিতে পারেন এ বোলাররা।
এই বিরল গুণটি শুধুই শারীরিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশল, চতুরতা এবং মানসিক দৃঢ়তার এক অনন্য সংমিশ্রণ। বিপক্ষ ব্যাটসম্যানের কাছে এটি যেন এক ধাঁধার নাম। প্রস্তুতি দূরে থাক, কোন দিক থেকে কী বল আসবে, তাই যেন বলা মুশকিল! এ আয়োজন এমন কিছু দুহাতি বোলারের গল্প নিয়ে, যারা ক্রিকেটের এই অসাধারণ দক্ষতাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন এবং খেলার ধরনটাই পাল্টে দিয়েছেন তাদের অভিনবত্ব দিয়ে।
পেছনের গল্প : ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার কোচ ছিলেন জন বুকানন। তখন তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন দুহাতি বোলারদের নিয়ে। কলকাতা নাইট রাইডার্সের কোচ থাকাকালেও নিজের দলে এমন বোলার খুঁজেছিলেন তিনি। ইতিহাস ঘাঁটলে এই প্রতিভার অধিকারী প্রথম যে ক্রিকেটারকে পাওয়া যায়, তিনি হলেন সারের লিওনার্ড শাটার। ১৮৭৬ থেকে ১৮৮৩ সালের মধ্যে ডানহাতে ফাস্ট ও বাঁহাতে ফিঙ্গার স্পিন করতেন তিনি। ইয়র্কশায়ারের ক্লেম উইলসনের শ্রদ্ধার্ঘ্যে উইজডেন লিখেছিল, ‘মিডিয়াম পেস করতেন এবং দুহাতেই তা কার্যকর করার অতুলনীয় শৈলীর অধিকারী ছিলেন।’ ১৯৩৫-৩৮ সালের দিকে দশটি টেস্ট খেলা অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার ‘চাক’ ফ্লিটউড-স্মিথকে কল্পকথা ছিল- তিনি ডানহাতি বোলার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন, পরে হাত ভেঙে গেলে বাঁহাতি বনে যান। তবে তার বোন পওলিন মোরন্যান নিশ্চিত করেন যে স্মিথের হাত কখনোই ভাঙেনি। ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে এই ঝলক দেখান পাকিস্তানের হানিফ মোহাম্মদ। ১৯৫৮ সালের টেস্ট ম্যাচে গ্যারি সোবার্সের অপরাজিত ৩৬৫ রানের রেকর্ড ইনিংস খেলার পথে ডান হাত ছেড়ে বাঁহাতে স্পিন করেছিলেন হানিফ। সাসেক্সের আরেক ক্রিকেটার চার্লস রোয়ে হানিফকেও ছাপিয়ে গেছেন। ১৯৮০ সালে ডানহাতি অফব্রেকে জিওফ আর্নল্ডকে বোল্ড করার পর বাঁহাতি রিস্ট স্পিনেও আরেকটি উইকেট তুলে নিয়েছিলেন রোয়ে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ক্যান্ডিতে কেনিয়ার বিপক্ষে শেষ ওভারটিতে প্রথম তিন বল বাঁহাতে করার পর শেষ তিন বল ডান হাতে করেছিলেন শ্রীলঙ্কার হাসান তিলকারত্নে। মূলত ব্যাটসম্যান হলেও ইংলিশ কিংবদন্তি গ্র্যাহাম গুচও পারতেন দুই হাতে বোলিং করতে।
একবিংশ শতকে : ২০০০ সালে লর্ডসে অনূর্ধ্ব-১৫ ওয়ার্ল্ড চ্যালেঞ্জের ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পাকিস্তানের স্পিনার মোহাম্মদ নাঈম ডানহাতি ব্যাটারদের বাঁহাতে এবং বাঁহাতি ব্যাটারদের ডানহাতে অফব্রেক করেছিলেন। অবশ্য তার পরও দুই উইকেটে ওই ম্যাচ হেরেছিলেন নাঈমরা। ২০১৬ সালের দিকে পাকিস্তানে পাওয়া যায় আরেক অ্যাম্বিডেক্সট্রাস বোলারের সন্ধান। প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি থেকে উঠে আসা ইয়াসির জান দুহাতে সমানতালে পেস বোলিং করতে পারতেন। আকিব জাভেদের মতে ডানহাতে ১৪৫ কিমি ও বাম হাতে ১৩৫ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিতে বল করতে পারা ইয়াসিরকে পিএসএলের দল লাহোর কালান্দার্স ১০ বছরের জন্য ডেভেলপমেন্ট চুক্তির আওতায় দলে ভেড়ায়। ইংলিশদের নেটে দুহাতে বল করে অ্যালিস্টার কুক ও জো রুটকে চমকে দেওয়া ইয়াসিরের ক্যারিয়ার অবশ্য বেশি দূর এগোয়নি।
বাংলাদেশের বিপক্ষে চলমান গল টেস্টে লঙ্কান একাদশে অ্যাম্বিডেক্সট্রাস বোলার রয়েছেন দুজন। কামিন্দু মেন্ডিস, যিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের বিপক্ষে এবং আইপিএলে এ কাজ এরই মধ্যে করেছেন। দ্বিতীয়জন, গলে টেস্টের অভিষেক ক্যাপ পরা থারিন্দু রতœায়েকে। গতকাল সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হককে সাজঘরে ফিরিয়েছেন ২৯ বছরের এ বোলার। ডানহাতে অফব্রেকের সঙ্গে বাঁহাতে স্লো অর্থোডক্স স্পিন করেন তিনি। গতকাল ১৫.৫ ওভার ডানহাতে অফস্পিন করার পর হাত বদলে বাঁহাতে টেস্ট ক্রিকেটে নিজের প্রথম ডেলিভারিটি দেন থারিন্দু।
কাছাকাছি সময়ে গ্ল্যামরগনের বেন ক্যালাওয়েও সারের বিপক্ষে ওয়ানডে কাপের ম্যাচে দুই হাতে বল করে উইকেটের স্বাদ পান। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে অক্ষয় কারনেওয়ার এবং মোকিত হরিহরন, জিম্বাবুয়ের চার্লস কুনজে, শ্রীলঙ্কার শ্যামসুন্দর কৃষ্ণাশ্রিরাম ও দেশান ফার্নান্দো, নিউজিল্যান্ডের লেচি বেইলিরাও আছেন এ তালিকায়।
নারী ক্রিকেটে : ডানহাতে পার্টটাইম অফস্পিন করতেন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটার শায়লা শারমিন। কিন্তু থ্রো করতেন বাঁ-হাতে। জাতীয় দলের দরজা খুলতে দুহাতেই বোলিং শুরু করেন শায়লা। ৩৫ বছর বয়সী শায়লা লাল-সবুজ জার্সিতে খেলেছেন ৯ ওয়ানডে ও ১৬ টি-টোয়েন্টি। ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দুই হাতেই বল করেছিলেন তিনি। গত বছর নারী দ্য হান্ড্রেডে নর্দান সুপারচার্জার্সের হয়ে খেলা ম্যারি কেলিও পারেন দুই হাতে ফিঙ্গার স্পিন করতে।
