জুলাইয়েই ‘জুলাই সনদ’

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৫, ০৭:২৩ এএম

আগামী জুলাই মাসের মধ্যে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্তের লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রিয়াজ। গতকাল মঙ্গলবার থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে। আজ ও কাল আরও দুদিন আলোচনা চলবে। বৈঠকের পর কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদের বিদ্যমান বিধান পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদের সদস্যরা শুধু অর্থ বিল এবং আস্থাভোট প্রদানের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। কিন্তু অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এ বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে।

গতকাল দুপুর ১২টায় ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়। আমন্ত্রিত দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী বৈঠকে যোগ দেয়নি। বৈঠক শেষে অধ্যাপক আলী রীয়াজ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বৈঠকে কমিশনের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. মো. আইয়ুব মিয়া, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।

চারটি স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদবিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, এস্টিমেশন কমিটি এবং পাবলিক আন্ডারটেকিংস কমিটিসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করার ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছেন। এ ছাড়া সংসদে নারীদের জন্য ১০০ আসনের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য পোষণ করেছে। তবে তাদের নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের সংবিধানে বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে কমিশনের সহসভাপতি জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে দুটি রাজনৈতিক দল ছাড়া বাকি রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। আগামীতে পুনর্বার আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যাবে। কমিশনের সঙ্গে গতকালকের আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। আজ বেলা ১১টায় আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবে কমিশন। এতে গতকালকের অসমাপ্ত আলোচনাসহ জাতীয় সংবিধান কাউন্সিল (এনসিসি), রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, জেলা সমন্বয় কাউন্সিল বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

জামায়াত কেন আসেনি, মন্তব্য করবে ঐকমত্য কমিশন : জাতীয় ঐকমত্য সংলাপে জামায়াতের অনুপস্থিতি নিয়ে মন্তব্য না করার সিদ্ধান্ত বিএনপির। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, সংরক্ষিত নারী আসন ও সংসদের স্থায়ী কমিটি নিয়ে বিএনপি জানাল তাদের অবস্থান। জাতীয় সনদে আস্থা ভোট ও অর্থ বিল বাদে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা নিয়ে ঐকমত্য সংলাপ চলাকালে বিরতিতে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এ বিষয়ে ঐকমত্য কমিশন মন্তব্য করবে, আমরা না।’

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন জানান, আস্থাভোট ও অর্থ বিল ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোটদানের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এ স্বাধীনতা কার্যকর হবে না এটাও স্পষ্ট করা হয়েছে।’

বিএনপি নেতা আরও জানান, প্রতিটি দল সংবিধান সংশোধনী সংক্রান্ত প্রস্তাবনায় নিজেদের অবস্থান যুক্ত করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও লিখিতভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

সংসদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটির নেতৃত্ব বিরোধী দলের হাতে ন্যস্ত করার বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, এস্টিমেশন কমিটি ও পাবলিক আন্ডারটেকিং কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর সভাপতির পদ আসন ভিত্তিতে বিরোধী দলের হাতে থাকবে।’

নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১০০ আসনের প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হলেও এ আসনগুলোর নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে বলে জানান বিএনপির এ নেতা।

জুলাই অভ্যুত্থানের সব অংশীদারের প্রতি সরকার নিরপেক্ষ : জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণ নিরপেক্ষ এবং ভারসাম্যপূর্ণ এমনটা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সচিব বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছে, তারা সবাই আমাদের অংশীদার। আমরা তাদের সবার কথাই শুনছি। সবার প্রতি আমাদের আচরণ নিরপেক্ষ। তিনি আরও বলেন, আগামী মাসের মধ্যেই ‘জুলাই চার্টার’ প্রস্তুত করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী। আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। আমরা আশাবাদী, জুলাইয়ের মধ্যেই এটা প্রকাশ করা যাবে।

আলোচনায় জামায়াতে ইসলামী কেন অংশ নেয়নি এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেরাই ব্যাখ্যা দিতে পারবে। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে এবং আমরা আশা করছি, আগামীকালকের (আজ) আলোচনায় তারা অংশ নেবে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, সম্প্রতি লন্ডনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যৌথ বিবৃতি প্রচার করায় এনসিপি ও গণ অধিকার পরিষদ অভিযোগ করেছে যে, প্রধান উপদেষ্টা ও ঐকমত্য কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জবাবে প্রেস সচিব বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছে, তারা সবাই আমাদের অংশীদার। আমরা তাদের সবার কথাই শুনছি। সবার প্রতি আমাদের আচরণ নিরপেক্ষ।

ঐকমত্য কমিশন কিংবা সরকার পক্ষপাতদুষ্ট : জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা পক্ষপাতদুষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হয়েছে যে, ঐকমত্য কমিশন কিংবা সরকারের ভূমিকা কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু পক্ষপাতদুষ্ট হচ্ছে কিংবা কোনো কোনো দলের প্রতি বিশেষ একটা প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এটা হলে এ সংস্কার কিংবা এই সময়ের সর্বজনীন বিষয়টা আমার মনে হয়, হারিয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘এখনো তো নির্বাচন হয়নি, কাজেই ভোট ছাড়া কোন দল বড়, কোন দল ছোট, মেজরিটি পার্টি তো আপনি নির্ধারণ করতে পারেন না। সরকার যদি আগেই কোনো কোনো পার্টির প্রতি একটা দৃষ্টিভঙ্গি রাখে যে এই পার্টি বড়, এই পার্টি মেজরিটি, তাহলে তো অনেক ক্ষেত্রেই অনেকের কথার গুরুত্ব থাকে না। সে ক্ষেত্রে আমাদের কাছে মনে হয়েছে যে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কিংবা সরকারের ভূমিকা কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু পক্ষপাতদুষ্ট হচ্ছে কিংবা কোনো কোনো দলের প্রতি বিশেষ একটা প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।’

আলোচনা সভায় জামায়াতে ইসলামীর অংশ না নেওয়ার বিষয়ে নুর বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলকে প্রাধান্য দেওয়া বা তাদের কেন্দ্রিক সংস্কার বা জাতীয় ঐকমত্যের আলোচনাটা নিয়ে যাওয়া প্রতীয়মান হওয়ার অভিযোগ জামায়াতসহ কিছু কিছু রাজনৈক দল করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেও গণআন্দোলনে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো সবার মতামত প্রতীয়মান করে না। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠনগুলো তথা সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসকদের মতামত নেওয়া দরকার।’

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি বলেন, ‘আমরা বারবার জোর দিচ্ছি, নব্বইয়ে তিন জোটের রূপরেখা হয়েছিল। সবাই ভালো ভালো কথা বলেছিল, লিখে দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে কেউ কথা রাখেনি। সে জায়গা থেকে আমরা বারবার গণভোটের মাধ্যমে এ সংস্কারকে বাস্তবায়ন এবং এর একটা লিগ্যাল বেসিস তৈরির জন্য আহ্বান জানিয়েছি।’

বিএনপির প্রস্তাবের দিকে ‘হেলে গেছেন’ ড. ইউনূস : ‘ঐকমত্য কমিশনে আসা অনেক দলের স্পষ্ট বক্তব্য থাকে না, শুধু একটি দলের প্রতি হ্যাঁ-না বলার থাকে’ বলেন এনসিপির প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম আদিব। দলটির রাজনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান আদিব বলেন, কমিশনের ছয়টি প্রস্তাবের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা যেটির দিকে ‘হেলে গেছেন’, সেটি মূলত বিএনপির দেওয়া প্রস্তাব।

আদিব বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ঈদের আগে (জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে) নির্বাচনের যে তারিখ (এপ্রিলের প্রথমার্ধ) ঘোষণা করেছিলেন ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি হিসেবে, সেখানে তিনি কমিশনের ছয়টি প্রস্তাবের মধ্যে একটির দিকে হেলে যান, যেটি দিয়েছে বিএনপি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত