দুর্নীতিতে শীর্ষে বিআরটিএ দ্বিতীয় স্থানে পুলিশ

আপডেট : ২০ জুন ২০২৫, ০৫:৪৭ এএম

গত এক বছরে যেসব নাগরিক সরকারি সেবা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে পুরুষ ৩৮ দশমিক ৬২ এবং নারী ২২ দশসিক ৭১ শতাংশ ঘুষ দুর্নীতির শিকার। সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নাগরিকদের সর্বাধিক ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হতে হয়েছে বিআরটিএ কার্যালয়ে। এখানে ৬৩ দশমিক ২৯ শতাংশ মানুষকে ঘুষ দিতে হয়েছে। এরপরই রয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বা পুলিশ। পুলিশের সেবা নিতে ৬১ দশমিক ৯৪ শতাংশ নাগরিক ঘুষ-দুর্নীতর শিকার হয়েছেন। পাসপোর্ট অফিসের সেবা নিতে ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের সেবা নিতে ৫৪ দশমিক ৯২ শতাংশ মানুষ ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সিটিজেন পারসেপশন সার্ভের (সিপিএস) প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিবিএস কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সন্ধ্যার পর নিজ এলাকায় চলাফেরা করতে নিরাপদ বোধ করেন না প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ। ৮৪ দশিমক ৮১ শতাংশ নাগরিক নিরাপদ বোধ করেন। বিবিএস মহাপরিচালক  মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. কাইয়ুম আরা বেগম এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে প্রকল্পের পরিচালক রাশেদ-ই-মাসতাহাব। প্রশ্নোত্তরপর্ব পরিচালনা করেন, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্মসচিব দীপঙ্কর রায়। জরিপটি পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশব্যাপী এটি পরিচালনা করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দুর্নীতি শিক্ষা ক্ষেত্রেও কম হচ্ছে না। আমি দেখেিেছ বদলি নিয়ে রীতিমতো ঘুষ বাণিজ্য চলে। গোয়েন্দা দিয়ে আমি দেখেছি, এখনো এত বেশি মাধ্যম ব্যবহার করা হয় যে, আসল দুর্নীতিবাজকে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক বৈষম্য নেই। দেশে কোনো বিষয়েই এই  বৈষম্য নেই। হিন্দু-মুসলমানতো নেই। তবে বৌদ্ধরা বরং কোনো ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তরা ভালো সুবিধা পেয়েছেন। এখানে বৈষম্যের কিছু নেই। তবে আমি মনে করি, যারা সরকারি সেবা নিয়েছেন, সবাইকেই ঘুষ দিতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে জরিপে তথ্যে বরং কম সংখ্যাই এসেছে।

জরিপের তথ্যে বলা হয়, নিরাপত্তা বিষয়ে জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ৮৪ দশমিক ৮১ শতাংশ নাগরিক সন্ধ্যার পর নিজ এলাকার আশপাশে একা চলাফেরা করতে নিরাপদ বোধ করেন। তবে পুরুষদের (৮৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ) তুলনায় নারীরা (৮০ দশমিক ৬৭ শতাংশ) কম নিরাপদ বোধ করেন। শহরাঞ্চলের নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ (৮৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ), গ্রামীণ এলাকার নাগরিকদের তুলনায় কিছুটা কম (৮৫ দশমিক ৩০ শতাংশ) পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধের হার ৯২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৯১ দশমিক ৮২ ও ৯৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

রাজনৈতিক প্রভাব বিষয়ের ক্ষেত্রে ২৭ দশমিক ২৪ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, তারা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারের কর্মকা- সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করতে পারেন। অন্যদিকে ৭২ দশমিক ৭৬ শতাংশ মতামত দিতে পারেন না। এক্ষেত্রে শহর (২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ) ও গ্রাম (২৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ) এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য না থাকলেও, লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য রয়েছে। যা পুরুষের ক্ষেত্রে ৩১ দশমিমক ৮৬ শতাংশ এবং নারীর ক্ষেত্রে ২৩ দশমিক ০২ শতাংশ। একইভাবে ২১ দশমিক ৯৯ শতাংশ নাগরিক মনে করেন যে, তারা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এই হার নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৮ এবং ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ৪৭ দশমিক ১২ শতাংশ নাগরিক গত এক বছরের মধ্যে অন্তত একবার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা গ্রহণ করেছেন। সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে ৮২ দশমিক ৭২ শতাংশ নাগরিকের মতে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সহজে প্রাপ্তিযোগ্য এবং স্বাস্থ্যসেবার খরচ সামর্থের মধ্যে ছিল। এক্ষেত্রে, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মান, সেবাগ্রহীতার সঙ্গে আচরণ এবং ডাক্তার/স্বাস্থ্যকর্মীদের সময় দেওয়ার বিষয়ে সেবা গ্রহণকারীদের সন্তুষ্টির হার যথাক্রমে ৬৫ দশমিক ০৭, ৬৩ দশমিক ১৩ এবং ৬৩ দশমিক ১৯ শতাংশ।

শিক্ষা ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৪০ দশমিক ৯৩ শতাংশ নাগরিকের কমপক্ষে একটি শিশু সরকারি প্রাথমিক অথবা মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। এরমধ্যে ৯৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ নাগরিক প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহজে প্রবেশযোগ্য (যেকোনো ধরনের যানবাহনে বা  হেঁটে ৩০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছানো যায়) ও ৯২ দশমিক ৬৬ শতাংশ নাগরিক রিপোর্ট করেন যে শিক্ষাব্যয় সামর্থের মধ্যে ছিল। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান মানসম্মত ছিল মর্মে যথাক্রমে ৬৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও ৭১ দশমিক ৮৬ শতাংশ নাগরিক মত প্রকাশ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ নাগরিক কোনো না কোনো বিবাদ বা বিরোধের মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৩ দশমিক ৬০ শতাংশ নাগরিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পেয়েছেন। এর মধ্যে ৪১ দশমিক ৩৪ শতাংশ আনুষ্ঠানিক (যেমন: আদালত, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ইত্যাদি) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং ৬৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক (যেমন: কমিউনিটি নেতা, আইনজীবী ইত্যাদি) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন।

জরিপে প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী, গত ১ বছরে দেশের ১৯ দশমিক ৩১ শতাংশ জনগণ কোনো না কোনো ধরনের বৈষম্য বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। নারীদের মধ্যে এই হার কিছুটা বেশি যা ১৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে তা ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ । শহরাঞ্চলে বৈষম্যের হার (২২ দশমিক ০১ শতাংশ) গ্রামাঞ্চলের (১৮ দশমিক ০৭ শতাংশ) তুলনায় বেশি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত