শিক্ষার্থী বহিষ্কারের প্রতিবাদে সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন

আপডেট : ২২ জুন ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ২২ শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারসহ পাঁচ দফা দাবিতে রাজধানীর ভাটারার নতুন বাজার এলাকায় সড়ক প্রায় ১০ ঘণ্টা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে তারা সড়ক অবরোধ করে রাখেন। কয়েক দফায় তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় পুলিশ। উল্টো পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে যান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। হয় ধাক্কাধাক্কিও। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবস্থানের পর নতুন কর্মসূচি দিয়ে সড়ক ছাড়েন তারা। রাত ৮টার মধ্যে সবার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না করলে রবিবার সকাল ১০টা থেকে আবারও নতুন বাজার ব্লকেডসহ কর্মসূচির ঘোষণা দেন তারা। তবে রাত ৮টার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২২ জনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে বলে জানিয়েছেন ভাটারা থানার ওসি রাকিবুল হাসান। এদিকে দিনব্যাপী অবরোধের কারণে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বাড্ডামুখী সড়কে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। রামপুরা, বাড্ডা, গুলশান, কুড়িল, বসুন্ধরাসহ আশপাশের এলাকায় সকাল থেকেই সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী চাকরিজীবী ও সাধারণ যাত্রীরা। এদিকে আন্দোলনের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে বিভ্রান্তি না ছড়াতে অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার সকালে সড়ক ব্লকেড করেন শিক্ষার্থীরা। সড়ক অবরোধ, তীব্র যানজটের খবরে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে পুলিশ। শিক্ষার্থীদের সড়ক ছেড়ে সরে যাওয়ার অনুরোধ করে পুলিশ। কিন্তু তা মানতে নারাজ শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এতে তিন শিক্ষার্থী আহত হন বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। পুলিশের অ্যাকশনে ছত্রভঙ্গ হয়ে কিছু সময়ের জন্য রাস্তা ছেড়ে দেন শিক্ষার্থীরা। তবে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই তারা আবারও সংগঠিত হয়ে পুনরায় সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে রাস্তায় শুয়ে পড়তে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের একটি দল দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতিও হয় তাদের। পুলিশ কয়েকজনকে শার্টের কলার ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে যায়।

দেখা যায়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভাটারা থানাসংলগ্ন কুড়িল থেকে রামপুরাগামী রাস্তা অবরোধ করেন। তবে সকাল থেকে রামপুরা হয়ে কুড়িলগামী রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ ছিল তাদের আন্দোলনের কারণে। দুপুরের পর এ রাস্তা থেকে ব্যারিকেড উঠিয়ে নেয় পুলিশ, ফলে যান চলাচল আবার শুরু হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশ তাদের ওপর হামলা করেছে। তারপরও তারা রাস্তা ছাড়েননি। পুলিশের মারধরে তাদের তিনজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। যতক্ষণ দাবি না মানা হবে ততক্ষণ তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তাদের ওপর পুলিশি হামলার বিচার করতে হবে।

আন্দোলনকারীরা স্লোগানে স্লোগানে তাদের দাবি জানাচ্ছেন। অবস্থান চলাকালে ‘পা চাটলে পুরস্কার, না চাটলে বহিষ্কার’; ‘বহিষ্কার প্রত্যাহার, করতে হবে করতে হবে’; ‘হয় বহিষ্কার বাদ যাবে, না হয় আমার লাশ যাবে’; ‘অথরিটি স্বৈরাচার, এবার তোরা গদি ছাড়’ প্রভৃতি স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনকারীদের একজন লাবিব মুহান্নাদ জানান, জুলাই অভ্যুত্থানে যে শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের ২৫ জনকে বহিষ্কার করেছে ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটি। ইউনাইটেড গ্রুপ আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোকে টাকা দিত। তারা জুলাই অভ্যুত্থানে জড়িত শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করেছিলেন, তাদের আশ্বাস দিয়ে আট মাস বসিয়ে রাখা হয়। পরে তারা ভিসির পদত্যাগসহ তাদের অধিকার রক্ষায় ফের আন্দোলনে নামেন। ওই আন্দোলন দমানোর জন্য ২২ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমরা তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চাই।

বেলা ১১টায় ঘটনাস্থলে ভাটারা থানার ওসি রাকিবুল হাসান বলেন, ‘প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে রাস্তা বন্ধ। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের ভোগান্তি দূর করতে আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছি। তারা সড়ক ছাড়তে নারাজ। এজন্য তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তারা পুনরায় রাস্তা রুদ্ধ করেছেন। আমরা ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছি।’

শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবি হলো : ইউআইইউ কর্তৃক অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত বহিষ্কার প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, বহিষ্কারের সঙ্গে জড়িত সব ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সঠিক তদন্ত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনা, ইউআইইউতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম-অসুবিধা ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে রিফর্ম দাবিগুলো বাস্তবায়ন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি স্বাধীন সংস্কার কমিশন গঠন করা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ কর বাতিল করা।

দিনভর অবরোধ-বিক্ষোভের পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাস্তা থেকে সরে যান শিক্ষার্থীরা। এ সময় রাত ৮টার মধ্যে সবার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারে আলটিমেটাম দিয়েছেন। এ দাবি মেনে নেওয়া না হলে আজ সকাল ১০টা থেকে আবারও নতুন বাজার ব্লকেড কর্মসূচি করার কথা জানান তারা। একই সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ।

এর আগে ইউআইইউ উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদল। বৈঠকে শিক্ষার্থীদের দাবি মানার আশ্বাস দেন উপাচার্য ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা। তবে এ আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করেন তারা।

রাত পৌনে ৮টার দিকে ভাটারা থানার ওসি রাকিবুল হাসান জানান, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিটিং শেষে বের হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২২ শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়েছে। এরপরও শিক্ষার্থীরা কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যেহেতু দাবি মেনে নিয়েছে, সেহেতু আন্দোলন তো করার কথা নয়। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা হবে। তিনি বলেন, ৩৯ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে ১৭ জনের বহিষ্কারাদেশ আগেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। শনিবার আন্দোলনের পর বাকি ২২ জনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এদিকে সড়ক অবরোধের ফলে কুড়িল বিশ্বরোড-বাড্ডা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রামপুরাগামী সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সরকারি অফিস বন্ধ থাকলেও সকালে সড়ক অবরোধের ফলে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন বেসরকারি চাকরিজীবীরা। এই ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বিকেলে অফিস ছুটির পরও।

অনেকে ওই রুট পরিহার করে অন্য রুট দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছান। কেউ কেউ গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে আন্দোলনস্থল পেরিয়ে আবার বাসে ওঠেন। তবে ওখানকার যানজট ছড়িয়ে পড়ে নগরীর দুইপ্রান্তে। এতে প্রায় সর্বত্র যানজটে পড়তে হয়েছে নগরবাসীকে।

দুপুর থেকে শিক্ষার্থীদের ব্লকেড কর্মসূচি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায় পুলিশকে। ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা ভাটারা থানার এসআই মো. সুলতান বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের সড়ক ছেড়ে পাশে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ করেছি, যাতে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়। তারা আমাদের জানিয়েছেন, কিছুক্ষণ থেকে তারা চলে যাবেন। কিন্তু তারা যাননি।

আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করতে কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপি জানায়, বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সড়ক ছাড়ছিলেন না আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সকাল সাড়ে ১০টায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয় এবং পুলিশ আন্দোলনকারীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। পরে ১৫ মিনিট পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আবার রাস্তা দখল করে আন্দোলন শুরু করেন। পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং কোনোরূপ বলপ্রয়োগ ছাড়া আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যায়। এরপরও কেউ কেউ ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত