ম্যারাডোনার নেপলস: দুটি অজানা গল্প, এক দেবতার পূর্ণতার প্রতিচ্ছবি

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৫, ০৯:০৬ পিএম

নেপলসের গলিপথে ইতিহাস এখনও শ্বাস ফেলে। মুরালের রঙে, কিশোরদের চোখে, পাঁজি ছেঁড়া কাগজের ফুটবলে — সর্বত্র বিরাজমান এক নাম, ডিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা। কিংবদন্তি এই আর্জেন্টাইনের জীবনের সঙ্গে নেপলসের যে আত্মিক সংযোগ, তা কেবল ফুটবল ইতিহাস নয়, এক জনপদের আরাধনার বিষয়।

সম্প্রতি ‘দ্য ওয়ে অব গড’ শিরোনামে ডিয়েগোকে নিয়ে মুরাল চিত্রণ সিরিজ চালাচ্ছেন আর্জেন্টাইন শিল্পী গাস্তন লিবার্তো। তাঁর কলমে উঠে এসেছে ম্যারাডোনার নেপলস অধ্যায়ের দুই অজানা অধ্যায় — একটিতে রয়েছে শিশুদের সঙ্গে খেলা সেই সেরা ম্যাচ, যা কেউ কখনও দেখেনি; অন্যটিতে রয়েছে এক জোড়া জুতো উপহারের বিনিময়ে বদলে যাওয়া এক জীবনের গল্প।

নব্বই দশকের এক দুপুরে, ম্যারাডোনা গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলেন। হঠাৎ চোখে পড়ল—একদল বাচ্চা ফুটবল খেলছে একটি সরু গলিতে। আর কি, ডিয়েগো তো ডিয়েগোই!

গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লেন। জুতো খুলে শিশুদের সঙ্গে শুরু করলেন খেলা—নগ্নপায়ে, হাসিমুখে, কাদামাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে! একসময় এক প্রতিবেশী তাকে পানি দিলেন। তিনি থেকে গেলেন আরও কিছুক্ষণ। খেললেন, গল্প করলেন। তারপর চুপিসারে আবার চলে গেলেন।

না, কোনো ক্যামেরা ছিল না, কোনও সংবাদ শিরোনাম হয়নি। শুধু ওই গলির মানুষের চোখে সেই মুহূর্ত এখনও দীপ্ত। ওটাই তাদের ‘সেরা ম্যাচ’, যা কেউ কখনও দেখেনি—শুধু অনুভব করেছে।

আরেকটি গল্প শিল্পী গাস্তনের কানে আসে মুরাল আঁকার সময়। এক যুবক বলেন, ‘আমার ছেলেবেলা কেটেছে নেপলসের এক কঠিন পাড়ায়। খারাপ পথে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল প্রবল। তখনই মাঝেমধ্যে ম্যারাডোনা দেখতেন আমাকে। বলতেন, তুই রাস্তায় ঘোরছিস কেন? খেলতে যা।’

সেই ছেলেটি একদিন হাসিমুখে চুপ করে থাকলেও, ম্যারাডোনা কিন্তু থেমে যাননি। একদিন গাড়ি থামিয়ে, ছেলেটির হাতে ধরিয়ে দেন একজোড়া নতুন ফুটবল বুট—ঠিক তার মাপের। ‘সেদিন থেকেই আমি বদলে যাই,’ বলেন সেই যুবক। ‘আমি তারকাখ্যাতি পাইনি, কিন্তু আমি পথ হারাইনি। ওই বুট জোড়া এখনও আমার কাছে আছে। কারণ, যেখানে কেউ আমাকে দেখত না… ডিয়েগো দেখেছিল।’

নেপলসের ভক্তদের কাছে ম্যারাডোনা ছিলেন অলৌকিক এক অস্তিত্ব। তারা বলে, ‘উত্তরের শহরগুলোর ছিল টাকা, বড় স্টেডিয়াম। আর আমাদের? আমাদের ছিল শুধু ডিয়েগো। সে বলেছিল, ‘ইতালিতে আর কারও হয়ে খেলব না।’ এটা কেনা যায় না, এটা বিশ্বাস।’

তারা আরও বলে, ‘সব নেপলিতানরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। কিন্তু সবাই ম্যারাডোনায় করে।’

নেপলসের অলিগলিতে ম্যারাডোনার মুরাল মানে শুধু চিত্র নয়, তা এক খোলা গির্জা। যেখানে প্রার্থনার ভাষা ফুটবল। সেই মুরাল যখন আঁকা হচ্ছিল, তখনই যেন আবার শোনা যাচ্ছিল কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত সেই কথা, ‘জীবন আমাদের কিছু দেয় না। কিন্তু ডিয়েগো আমাদের দিয়েছিল সবকিছু।’

এবং তাতেই শেষ নয়, শুরু হয় এক দেবতার অনন্ত যাত্রা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত