এশীয় ভূখণ্ড বাংলাদেশ তো বটেই, চলমান বিশ্ববাস্তবতা যা কিনা উত্তর সমাজতন্ত্র যুগকে ধারণ করে আছে, তার ছায়া-শরীর ভেসে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকালের শব্দশূন্য বিষণœতা তো আছেই, বিপরীতে রয়েছে আন্তঃসংঘাতে পূর্ণ অস্থিরতার আধার। দুঃখ আছে, যন্ত্রণা আছে আবার সঙ্গে রয়েছে আশাবাদ ও আনন্দে পৌঁছার তাড়না। এ এক জটিল বিশ্ববাস্তবতা, যার সঙ্গে একীভূত হয়ে আছে ব্যক্তি মানুষের অনন্ত সুখ প্রত্যাশা। কেন জানি না বারবার মনের ভেতর উঁকি-ঝুঁকি মারে গ্রিক পুরাণের আখ্যান। সঙ্গে থাকে বাইবেলীয় ঐশ্বরিক উচ্চারণ লেট দেওয়ার বি লাইট, দেওয়ার ইজ লাইট। আলো... আলো... আগুন, অগ্নি। গ্রিক পুরাণ কী বলে? কী বলে ইতিহাসের আদি ইতিহাস? খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ভাগে এথেন্সের খোলা মঞ্চে অভিনীত হতো সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’। রাজন্যবর্গ, অভিজাত শ্রেণিকে বিমুগ্ধ করত ইস্কাইলাসের ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’ নাটক। নায়ক প্রমিথিউস মাউন্ট অলিম্পায়ার থেকে আগুন চুরি করে মানব প্রজাতিকে দান করে। এটা করতে হয় তাকে স্বর্গের রাজা জিউসের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে। জিউস চেয়েছিলেন, অগ্নিগ্রাসে মানব প্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে। পারেনি। কারণ ততদিনে মানুষ আগুনের ব্যবহার এবং সংরক্ষণের কৌশল শিখে ফেলেছে। পাঠক দেখবেন বিরহ-বিচ্ছেদে যন্ত্রণাকাতরতা আছে, ভেঙে যাওয়া লণ্ডভণ্ড স্বপ্নের আর্তনাদও আছে। পর মুহূর্তেই ব্যক্তি অনুভবের এই অন্ধকার আকাশ বিচূর্ণ হয়ে জেগে ওঠে আলো আর উত্তাপের সূর্য। দেয়ার ইজ লাইট।
গভীরে প্রবেশ করার শুরুটায় আমাদের এ বিষয় জেনে নিয়েই পা-বাড়াতে হবে। আশা ভঙ্গের হতাশাও ছড়িয়ে আছে। কিন্তু পর মুহূর্তেই তার পুনর্জাগরণ ঘটে। আচমকা মনে হবে, শরীর ছেড়ে (নিদ্রা-জাগরণের মতো) পালিয়ে গেছে আত্মা। কিছুটা সময় কেটে গেলে ঘুমন্ত মানুষ জেগে ওঠে। তখনই শরীরে আত্মা ফিরে আসে। এমনি জটিল খেলা চলে। হতে পারে সে প্রেমের কিংবা গার্হস্থ্য জীবনের অথবা রাজনীতির। প্রমিথিউসের আদি অগ্নি আমরা খুঁজে পাই। কখনো জাগ্রত, কখনো ঘুমন্ত। এ কথা তো মেনে নিতেই হবে সাহিত্য কখনো রাজনীতি বিবর্জিত হয় না। রাজনীতি তো শুধু ‘নীতির রাজা’ নয়, আরও অন্য অনেক। যদিও অনেকে ভুল করে বলেন ‘রাজার নীতি’। ভয়ার্তের খাদ্য গ্রহণ এবং জাগ্রতের উচ্চ চিৎকারেও রাজনীতি আছে। রাজনীতি আছে প্রেম, বিরহ, মিলন, বিরোধে। কি, কেন, কেমন করে এসব প্রশ্ন তো রাজনীতিরই। কলাকৈবল্যবাদীরা ‘রাজনীতি’ শব্দটাকে দেখেন সংকীর্ণ অর্থে। তাই সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ককে বিরোধার্থেই বিবেচনাযোগ্য। গত শতকের চারের দশকে বিশ্বযুদ্ধউত্তর বাস্তবতার ভেতর ইঙ্গমার্কিন উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ পাকিস্তান নামক যে নয়া রাষ্ট্রটির জন্ম দেয় পূর্ব-পশ্চিমের ভূগোলের গোলকধাঁধায়, তখন বিশ্ব ছিল রণক্লান্ত। বাঙালিরা খপ্পরে পড়ে এক আধা সামন্তবাদী, আধা পুঁজিবাদী কিন্তু চেতনায় উপনিবেশবাদী ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ আশ্রয়ী পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের। মাত্র দুই দশক আয়ুষ্কাল পেল রাষ্ট্রটি। রক্তাক্ত যুদ্ধ এবং অগণন মৃত্যু-ধর্ষণের ত্যাগে বাঙালিরা স্বাধীন হয়ে গেল। একদিকে স্বপ্নপূরণ এবং অন্য প্রান্তে স্বপ্নভঙ্গের যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় পতিত হয় নয়ারাষ্ট্র, তারই সাংস্কৃতিক প্রজন্ম আমরা। রাষ্ট্র এবং রাজনীতির পরিণামের বোঝা বইতেই হয়, তৎকালের মানুষ এবং চিন্তক সমাজকে।
অঙ্কুর থেকে বিকাশকালের ঊর্ধ্ব গমনের সিঁড়ি। মানব শরীরের মতোই নানা উপাদান দিয়ে গঠিত শরীর। তাই জীবন বা জীববিজ্ঞান আর কবিতাবিজ্ঞান একে অন্যের প্রতিচ্ছায়া। মহামান্য আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার মতোই আমাদের রাজনীতির উত্থান-পতন, সমাজ জীবনের আলোড়ন-বিলোড়ন, ব্যক্তি ও সমষ্টির আবেগ-অনুভূতিকে ধারণ করেছে। এখানে ঠিকানা-পথের নির্দেশ স্পষ্ট। জটিল আঁকাবাঁকা দুর্বোধ্য অন্ধকার অলিগলির ভৌতিক ম্যাজিক তৈরি করেনি। যেহেতু ক্রম-বিবর্তনের ধারাকে দূরে ঠেলে আমাদের এগোতে হচ্ছে। আমাদের অনুসন্ধান দার্শনিকতা এবং মতাদর্শের অলিগলি। রাজনীতির দক্ষিণপন্থাকে বর্জন করে প্রগতির ধারা বা বিপ্লবী বামপন্থাকেই তার সৃষ্টিকর্মে স্থাপন-প্রতিস্থাপন করা জরুরি। এক্ষেত্রে কেন জানি না তুরস্কের নির্বাসিত বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমতের কথা মনে পড়ে। তার মাতৃভূমি তাকে ছিনিয়ে নেওয়া নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয় মৃত্যুর পর। ভালোবাসা তাকে ভিখারি বানায়নি। বানিয়েছে সৃষ্টিশীল কবি। সমাজতন্ত্র-উত্তর চলমান সময়ে গণতন্ত্র প্রায় বিধ্বস্ত। ছানা উড়ে যাওয়া পাখির ডিমের ভাঙা খোলসের মতো রূপ নিয়েছে গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী। এই খোলস গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি হচ্ছে অর্থ আর সন্ত্রাস। ভোটের গণতন্ত্রে ভোট বা নির্বাচন দানবের প্রতিকল্প হয়ে উঠেছে। কী ভয়ংকর রাষ্ট্র বাস্তবতা? এই বীভৎস উত্তর-সমাজতন্ত্রের যুগে গণতন্ত্রকে বানায় বিষাক্ত চাবুক! এই কাল বিচার মাতৃভূমির নামের জনগণতন্ত্রী প্রজাতন্ত্র কী? এমনি উচ্চারণে আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় শরীরী ভাষা, তীর বিদ্ধ আত্মার ভাষা। আমরা খুঁজে পাই বিদ্রোহ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বিপ্লবের আগুন উত্তাপ। মানব প্রজাতিকে স্মরণ করিয়ে এই চলমান রাজনীতি প্রতারণার মধুর চুম্বনে, ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক বিষ আছে যা চাবুকেও নেই। এটাই তো চলমান বিশ্ববাস্তবতা। অতি অবশ্যই কি জাতীয় বাস্তবতাও?
ছদ্মবেশী গণতন্ত্র চিরকালই সময়কে নিষিদ্ধ করে রাখতে চায়। তাই চিৎকার করে করতে হয় প্রতিবাদ। প্রাণঘাতী করোনাকবলিত বিশ্ব নিয়ে আতঙ্কিত। গৃহবন্দি মানবজাতি, বন্দি সভ্যতা। মুক্ত কেবল উচ্ছিষ্টভোগী কাকেরা। ক্ষুধার পৃথিবীর তালিকায় তাদের নাম নেই। কেননা তারা চির আশ্রয়হীন, চির উদ্বাস্তু। চোখে বিশ্বমানবের বিপুলাংশ অভুক্ত-উদ্বাস্তু। কেননা, পৃথিবীর সব কাকই উদ্বাস্তু, আশ্রয়হীন বিশ্ববিপন্নতাকে এমন করে আবিষ্কার শিল্পের ভেতর সহজসাধ্য নয়। আনন্দ কিংবা বিমুগ্ধতার বদলে এক বিভীষিকা আর বীভৎস পৃথিবীর সামনে তাড়িয়ে নেয়। আতঙ্কিত নাগরিক সমাজ নিজেদের আবিষ্কার করে এক নতুন বঙ্গদেশে। বিধ্বস্ত গণতন্ত্র আর সংবিধান। একদিকে পর্বতপ্রমাণ লুটেরা দলের সম্পদ, অন্যদিকে ক্ষুধার্ত গণমানুষ। বিশ্বশান্তির নামে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, আমরা আতঙ্কিত-শিহরিত হই। বৃহৎ বিশ্বশক্তির ভয়ে আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি। ক্ষুধার্ত, দরিদ্র, শিক্ষাবঞ্চিত যন্ত্রণাবিদ্ধ রাষ্ট্র-সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার মুখ, প্লাবন-ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে। দর্শন ক্ষেত্রে আমরা ক্ষুধা আর সম্ভোগের তর্ক-বিতর্ক শুনেছি। কে শক্তিমান তা-ও চেনার জন্য আঁতিউঁতি করেছি। আমরা ক্ষুধার শক্তিতে বিশ্বাসী। ধনীরা নিজ নিজ সুবিধামতো রাষ্ট্র ভাগ করে নিয়েছে। সার্বভৌম ক্ষুধা ছাড়া গরিবের কোনো রাষ্ট্র নেই। যে রাষ্ট্রহীন দরিদ্রের একমাত্র রাষ্ট্রিক আইডেনটিটি, এমন নির্মম সত্যকে শব্দ বন্ধনে আবদ্ধ করা সহজসাধ্য নয়। ক্ষুধাকে সার্বভৌমর প্রতিকল্পে তোলা বা বোধে অনুভব তো করতে পারে ক্ষুধার্তের উদর।
দাঙ্গা আর সাম্প্রদায়িকবিরোধী উচ্চারণ ‘সংখ্যালঘু’র জন্য। কেউ কেউ হয়ে ওঠেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুর বিশ্বপ্রতীক। সুস্পষ্টভাবে তাদের একজনকে সাক্ষী রেখেই দাঙ্গায় বিধ্বস্ত বরিশালের জেলেপাড়ার হতদরিদ্র কায়াহীন, ছায়াহীন গৌরবহীন, বর্ণহীন, গোত্রহীন, শ্রেণিহীন মানুষের কথা বলি। যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’র কুবেরদের ‘আরেক জন্মের’ আখ্যান কথা। মালোপাড়ার মানুষের দুশমন কে? উচ্চ বর্ণাশ্রয়ী ব্রাহ্মণ্য বর্ণবাদ? অভিজাত শ্রেণি? ভূমিগ্রাসী? ধর্মীয় সংখ্যাগুরু? ধর্ম? কিন্তু আসল শত্রু হচ্ছে শাসকের শ্রেণি রাজনীতি। স্বৈরাচারী শাসক তার ব্যর্থ শাসনের অন্ধকারকে ঢাকা দিতে, জনদৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতাকে। তাই তো বলহীন, প্রতিবাদহীন মানুষকে মাটি তাদের দেয়নি ঠাঁই, জলেও তারা পায়নি অভয়, মাথার ওপর থেকে ছায়াটুকু সরিয়ে নিল আকাশ। আক্ষেপের নির্জনতায় হয়তো বিষণœতার ছায়ায় ভেসে ওঠে স্মৃতির স্মৃতিময়তা। সেই স্বাধীনতার স্বপ্ন, একাত্তরের যুদ্ধ, তেভাগা আন্দোলন, মওলানার ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একুশের শহীদ মিনার, আরও কত কী! রাজনীতিহীন রাজনীতির নষ্ট রাজনীতি, গ্রাস করেছে কি স্বপ্নের স্বদেশ? মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ মনুষ্যত্বের অর্জন। যখন বারুদের গন্ধ আর গুলির শব্দ হয়ে দানবের জন্ম দেয়, আমরা যেন দেখতে পাই তাকে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর, হঠাৎ হারানোকে সামনে দেখে বড় করুণ কণ্ঠে মৃদু স্বরে জানতে ইচ্ছে হয়, কেমন আছ জন্মভূমি? তেমনটিই আছ, যেমনটি তোমাকে দেখেছিলাম শৈশব, কৈশোরে!
লেখক: কথাসাহিত্যিক
