রাজস্ব কর্মকর্তাদের পর এবার সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশে টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল। তার মতে, পাশের দেশকে (ভারত) সুবিধা দিতে সরকার টেক্সটাইল খাতে নতুন ও বাড়তি কর চাপিয়ে দিয়েছে। তবে সমালোচনা করলেও দেশের শিল্প মালিকদের সরকারের মিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তুলা আমদানিতে ২ শতাংশ এআইটি (অগ্রিম আয়কর) আরোপ, করপোরেট কর ১৫ শতাংশ পুনর্বহাল এবং দেশীয় টেক্সটাইল মিলে উৎপাদিত সুতার ওপর উৎপাদন পর্যায়ে কেজিপ্রতি সুনির্দিষ্ট ৫ টাকা কর আরোপ করা হয়েছে। অবিলম্বে সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলশান ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বিটিএমএ। এ সময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে টেক্সটাইল খাতে সব ‘বৈষম্যমূলক‘ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে শিল্প মালিকদের ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষণে তিনটি দাবি জানানো হয়েছে। এ সময় বিটিএমএ নেতারা উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের মতামত তুলে ধরেন।
শওকত আজিজ বলেন, ‘আমি যদি ভারত থেকে বন্ডের মাধ্যমে সুতাগুলো নিয়ে আসি, তাহলে আমার এগুলো (আগাম, উৎসে এবং করপোরেট কর) কিছুই লাগবে না। কোনো ঝামেলাই নেই। দামেও কিছু সাশ্রয় হবে। তাহলে কি আমরা নিয়মনীতি করছি পাশের দেশকে সচ্ছল করার জন্য? তাদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য? সরকার কি নিরলসভাবে তাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে? এখানে ভাবার বিষয় আছে।
সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার মনে করে, সবসময় আমরা সরকারের সমালোচনা করি। আসলে সমালোচনা না, আমরা আলোচনা-সমালোচনা দুটোই করতে চাই। কারণ সমালোচনা না করলে আপনি (সরকার) কেমন করে বুঝবেন আমাদের অবস্থা কী? আর তখনই তো আপনি (সমালোচনা করলে) কাগজ-কলম নিয়ে নামবেন। আমি যদি সমালোচনাই না করি বা আমাকে যদি সমালোচনা করতে বন্ধ রাখেন, একটা সময় আসবে অনুশোচনারও সময় পাবেন না।’
এ সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অনেকবার আপনাদের সামনে এসেছি। তখনকার বিষয় আর এখনকার বিষয় এক না। আজকের ব্যাপারটা একটু বেশি ভয়াবহ। ভীষণভাবে ভয়াবহ। এভাবে ১ বা ২ শতাংশ (কর) বসিয়ে যদি মনে করেন অনেক টাকা চলে আসবে, এটা ঠিক না। আসলে আপনি কাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। সেটা তো আপনাকে নির্ণয় করতে হবে। সরকারের সব জায়গা থেকে ব্যবসা করা উচিত না। এটা সরকারের মডেলও হওয়া উচিত না। আজকে আমাদের সব থেকে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্প। বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে তৈরি পোশাক খাত। আপনি এটাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছেন! আমি মনে করি, সরকার আমাদের নিয়ে বসুক। কারণ আমরা সরকারের শত্রু না, আমরা মিত্র। কারণ আমাদের যদি দুটি পয়সা লাভ হয়, তাহলে আমার সরকারকে দিতে অসুবিধা নেই। এতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। কিন্তু আমাকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিয়ে, আমাকে কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য করবেন এটা কিন্তু সঠিক না। এটা তো বোঝেন, আমার মধ্যে যদি রক্তপ্রবাহ হয়, আপনার শরীরে কী কী উপকার হবে?’ যোগ করেন তিনি।
সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বিটিএমএর প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আপনারা তো কোনো কর্মসংস্থান করতে পারেননি, বরং বেতন বাড়াতে পেরেছেন। এখন আপনারাও (নীতিনির্ধারণীরা) সিদ্ধান্ত নেন সরকারি কর্মচারীরা তাদের বেতন থেকে ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর দেবেন। কারণ দেশ খারাপ অবস্থায় আছে, এটি করা গেলে আমরাও দেব। উদাহরণ আছে, সরকারকে সহযোগিতার জন্য জাপানের মানুষ এক বেলাও খেয়ে থেকেছে। আমরাও চলেন এক বেলা খাই। কিন্তু তা না করে আপনাদের ছুটির সংখ্যা বাড়ে, বেতন বাড়ে, আরও কী কী যেন বাড়ে। সবই তো বাড়ছে। দেশের খরচের ৮০ ভাগ তো সরকারের জন্য চলে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুনেছি, সরকার এখন বড় প্রকল্প নেবে না, আগে হাড্ডি-মাংস শক্ত করবে। কিন্তু পত্রপত্রিকায় দেখি ভোলায় সেতু হয়ে যাচ্ছে, এটা হয়ে যাচ্ছে, সেটা হয়ে যাচ্ছে, বিদেশিরা টাকা না দিলে নিজেই করে ফেলব। আগে নিজের শিল্পগুলো বাঁচান!’
বিদেশি বিনিয়োগ বিষয়ে বিটিএমএ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ তো হচ্ছেই না। কেউ কি বলতে পারবেন, গত আট মাসে অমুক চায়নিজ কোম্পানি পোশাক কারখানায় বা টেক্সটাইল কারখানায় বিনিয়োগ করেছে বা যৌথ উদ্যোগে (বিনিয়োগ) করেছে।’
বিটিএমএর তিন প্রস্তাব : তুলা আমদানিতে ২ শতাংশ অগ্রিম কর (এআইটি) অবিলম্বে প্রত্যাহার করা; বস্ত্র উৎপাদনে জড়িত কোনো সুতা উৎপাদন, সুতা ডায়িং, ফিনিশিং, কোনিং, কাপড় তৈরি, কাপড় ডায়িং, প্রিন্টিং অথবা এ প্রক্রিয়ার এক বা একাধিক প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কোনো মিল/কোম্পানির শিল্পের ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়ের ওপর প্রদেয় আয়করের হার একই শিল্প খাত হিসেবে আগের নিয়মে তৈরি পোশাকশিল্পের সমপরিমাণ (১২ শতাংশ) ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা এবং দেশীয় টেক্সটাইল মিলে উৎপাদিত কটন সুতা ও কৃত্রিম আঁশ এবং অন্যান্য আঁশের সংমিশ্রণে তৈরি সুতার ওপর উৎপাদন পর্যায়ে কেজিপ্রতি সুনির্দিষ্ট কর ৫ টাকা অব্যাহতি দেওয়া।
