বেড়েছে আত্মহত্যা, ৬৭ শতাংশই নারী

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৫, ০৩:৫৫ এএম

টাঙ্গাইলের সখীপুরে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত এক মাসেই বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ, কিশোর-তরুণসহ ৯জন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। এদের মধ্যে ৬ জনই নারী। শতকরা হারে তা ৬৭ শতাংশ। পারিবারিক কলহ, মানসিক সমস্যা, জমিজমা নিয়ে বিরোধ কিংবা সামাজিক চাপ একাধিক কারণ ঘিরে তৈরি হয়েছে মৃত্যুর এই হতাশাজনক মিছিল।

গত এক মাসে উপজেলায় যারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন তারা হলেনÑ গত ৩ জুলাই গড়বাড়ি গ্রামের রাবেয়া আক্তার (২৫), ১ জুলাই হতেয়া পূর্বপাড়া এলাকার সুবর্ণা আক্তার (২০), ২৭ জুন হাতীবান্ধা পূর্বপাড়া এলাকার ফিরোজা বেগম (৬০), ২৬ জুন কালিয়ানপাড়া বুরহান মার্কেট এলাকার তরফ আলী (৪২), ২১ জুন কাকড়াজান ইউনিয়নের বেড়িখোলা গ্রামের অনন্যা আহমেদ সেতু (১৯), ২০ জুন ইন্দারজানী চাটারপাড়া এলাকার জসিম উদ্দিন (২৩), ১৮ জুন সুরিরচালা গ্রামের ফারুক (১৮), ১৬ জুন কাকড়াজান ইউনিয়নের চকপাড়া গ্রামের আমিনা বেগম (৪৫), ১৩ জুন দাঁড়িয়াপুর ইউনিয়নের খোলাঘাটা গ্রামের মীম আক্তার (১৯)।

পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাবেয়া আক্তার পারিবারিক কলহে বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন। ফিরোজা বেগম মানসিক অসুস্থ ছিলেন। এক মাস ধরে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন তিনি। সেখানেই গাছের সঙ্গে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। সুবর্ণা আক্তার পারিবারিক কলহে ঘরের আড়ার সঙ্গে ফাঁস নেন। তরফ আলী জমিজমা নিয়ে বিরোধে মানসিক চাপে গাছের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। অনন্যা আহমেদ সেতু পারিবারিক সমস্যায় বিষ খেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন। জসিম উদ্দিন দাম্পত্য কলহের জেরে বিষপান করেন। ফারুক নামের তরুণও বিষপানে আত্মহত্যা করেন। আমিনা বেগম পারিবারিক সমস্যায় গাছের সঙ্গে ফাঁস নেন। মীম আক্তার পারিবারিক কলহে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেন বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও বহুরিয়া ইউনিয়নের প্রশাসক (চেয়ারম্যান) মনসুর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পশ্চিমা সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে ঢুকে যাওয়ায় সামাজিক অবক্ষয় ঘটেছে। সংসারে অশান্তি বেড়েছে। অনেকে অনেক চাপ নিয়ে চুপচাপ থাকেন। আমাদের গ্রামীণ সমাজে মানসিক সমস্যা বলতে লজ্জা পায়। অথচ ঠিক সময়ে কাউকে বললে হয়তো জীবনটা বাঁচত। ইউনিয়ন পর্যায়ে সামাজিক সমস্যাগুলো দ্রুত মীমাংসার জন্য গ্রাম আদালত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।’

হাতিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রহিজ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। চাহিদা পূরণ না হলেই অভিমান করে। অভিমান থেকেই আত্মহত্যা করে। বাল্যবিয়ের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের দূরত্ব থেকেও সংসারে অশান্তি হয়, এক পর্যায়ে আত্মহত্যা করে। এজন্য স্কুল-কলেজ থেকেই কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’

আত্মহত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রেহানা পারভীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করছি। অনেক উপজেলায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার আছে, কিন্তু এ উপজেলায় নেই। আমরা এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এ সেবা চালু করার উদ্যাগ নেব। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে যাতে কাউন্সেলিং করা যায়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব।’

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সখীপুরে আত্মহত্যার এই ধারাবাহিকতা সমাজের গভীর সংকেত। এই প্রবণতা দূর করতে হলে পরিবার, সমাজ, প্রশাসন এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না, শুধু নাম আর সংখ্যা বদলাবে!

সখীপুর থানার ওসি আবুল কালাম ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে থাকে একটি বেদনার গল্প। প্রতিটি ঘটনায় প্রমাণ হয়, কোথাও না কোথাও আমরা ব্যর্থ হয়েছি তাকে আগলে রাখতে। তবে এখনই আমাদের ভাবতে হবে, এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। প্রশাসনের ভূমিকার চেয়ে, সচেতনতা বেশি জরুরি বলে মনে করছি। আমরা ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছি মসজিদে-মসজিদে ইমাম সাহেবদের মাধ্যমে ধর্মীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে। এ ব্যাপারে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত