দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ব্যবসায়ীরা। সংগঠনটি মনে করে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টেক্সটাইল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গতকাল রবিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা উল্লেখ করে বিটিএমএ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ৭ জুলাই বিটিএমএর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতের নেতাদের সঙ্গে সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান ও সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সভা হয়। সভায় টেক্সটাইল শিল্প-সংশ্লিষ্ট সুতা উৎপাদনে ব্যবহার্য প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানিতে ২ শতাংশ অগ্রিম কর বা এআইটি অবিলম্বে প্রত্যাহার, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মতো ১৫ শতাংশ করপোরেট করব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং দেশীয় টেক্সটাইল মিলে উৎপাদিত কটন সুতা এবং কৃত্রিম ও অন্যান্য আঁশের সংমিশ্রণে তৈরি সুতার ওপর কেজিপ্রতি সুনির্দিষ্ট কর ৫ টাকা অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
জানা গেছে, পৃথিবীর কোনো দেশেই মধ্যবর্তী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে সাধারণত কোনো ধরনের কর আরোপ করা হয় না। সভায় সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিষয় সমাধানের আশ^াস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তার কোনোটি বাস্তবায়ন হয়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা পাশের দেশের সুতা উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন বলে মনে করে সংগঠনটি।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সরকারের বৈঠকের সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে বিটিএমএর প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বিটিএমএ বেসরকারি খাতে টেক্সটাইল শিল্প দেশের সর্ববৃহৎ সংগঠন, এর সদস্য সংখ্যা ১৮৫৮। এর মধ্যে স্পিনিং, উইভিং এবং ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বেসরকারি খাতে একক বিনিয়োগ হিসেবে সর্বাধিক। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশের অধিক অর্থ টেক্সটাইল এবং অ্যাপারেল খাত থেকে আসে। যার প্রায় ৭০ শতাংশের জোগানদাতা বিটিএমএর নেতৃত্বাধীন টেক্সটাইল খাত এবং এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৩০ ভাগ। তাই বিটিএমএর সদস্য মিলগুলো বর্তমানে দেশের আমদানি পরিপূরক শিল্প হিসেবে বিবেচিত। তৈরি পোশাকসহ টেক্সটাইল এবং অ্যাপারেল খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৫ বিলিয়ন ডলার এবং সরকারের যথাযথ সহযোগিতা পেলে রপ্তানি আয় ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার করা সম্ভব। একই খাতভুক্ত শিল্প হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই টেক্সটাইল খাতের যেকোনো সমস্যা সাপ্লাই চেইনে সংযুক্ত তৈরি পোশাক খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সভায় বিটিএমএর প্রতিনিধিদল প্রতিবেশী দেশ ভারতের টেক্সটাইল শিল্প কীভাবে তাদের সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা এবং সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করে, তাদের স্থানীয় বাজারে তুলনায় কমমূল্যে অর্থাৎ ডাম্পিং মূল্যে আমাদের দেশে রপ্তানি করছে এবং ফলে আমাদের টেক্সটাইল শিল্প কী ধরনের প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করে।
বিজ্ঞপ্তিতে বিটিএমএর প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘কভিড-১৯-পরবর্তী পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিশ্ব মন্দার কারণে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি আমাদের শিল্প, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টেক্সটাইল খাতে বহুবিধ সমস্যার মধ্যে গ্যাসের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধীকরণ, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের সংকট, টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ঘাটতি, ব্যাংক সুদের হার ৯ থেকে ১৫-১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং রপ্তানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনার অস্বাভাবিক হ্রাস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
উল্লিখিত সমস্যাবলি ছাড়াও প্রতিবেশী দেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে কোনো ধরনের ডিউটি পরিশোধ ছাড়া অবাধে সুতা আমদানি করা হচ্ছে। ফলে দেশীয় শিল্পের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এবং মিলগুলো অচিরেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
সংকট সমাধানে বিটিএমএর প্রস্তাব : বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ওয়ার্কিং ক্যাপিটালপ্রাপ্তিতে সহায়তা করা, দ্রুততার সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব পলিসি নির্ধারণ করা, সময়োপযোগী ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য যখন-তখন বৃদ্ধি না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, যেসব ব্যবসায়ী ঋণ ঝুঁকিতে পড়েছেন, তাদের এক্সিট প্ল্যানের মাধ্যমে অব্যাহতি দেওয়া, নতুন নতুন সেক্টরে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে সহযোগিতা করা ও নীতি সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করা এবং পুরনো ব্যবসায়ীদের ওপর ট্যাক্সের পরিমাণ বৃদ্ধি না করে সরকারের উচিত নতুন নতুন করদাতার সন্ধান করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
