পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড) চত্বরে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার তদন্তে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সোহাগকে হত্যার পর মামলা থেকে বাঁচতে ‘মব’ তৈরির চেষ্টা করে খুনিরা। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে টেনেহিঁচড়ে প্রকাশ্যে নিয়ে উল্লাস করে খুনিরা।
হত্যাকান্ডের পর গ্রেপ্তার মূলহোতা মাহমুদুল হাসান মহিন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার পরিকল্পনা, সোহাগকে ভাঙাড়ি দোকানে হত্যা না করে মিটফোর্ড চত্বরে ধরে এনে প্রকাশ্যে হত্যা, তারেক রহমান রবিন ও টিটনের সাথে কিলিং মিশন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, অস্ত্র সংগ্রহের পরেও নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা এবং হত্যার পর উল্লাস করার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। ইতিমধ্যে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন তারেক রহমান রহমান রবিন। গ্রেপ্তার টিটনসহ অন্য আসামিরাও পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কারণ ও বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপন্তরকে জানিয়েছে, মহিন রাজনৈতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা যখনই টাকা প্রয়োজন ছিল তখনই সোহাগের কাছ থেকে টাকা নিত। কিন্তু গত জুন মাস থেকে ফিক্সড চাঁদা চাওয়াতেই বেঁকে বসেন সোহাগ। আর এই বিষয় নিয়েই দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু শত্রুতে পরিণত হয়। মূলত মহিন ও টিটন গাজী পরিকল্পনা করেন সোহাগকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার। তাদের ধারণা ছিল- ভাঙাড়ি দোকানে অনেক লাভ। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় সোহাগের কারণে অতিষ্ঠ থাকত ওই এলাকার মানুষ। সোহাগ কিছুটা উগ্র ছিল। তাই সোহাগ এই মারধর থেকে বেঁচে ফিরলে খুনিদের অবস্থা খারাপ হতে পারে এই ধারণা থেকে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আর সোহাগকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলে ‘সোহানা মেটাল’ নামে দোকানটি তাদের হয়ে যাবে এবং পুরো এলাকার ভাঙাড়ি ব্যবসা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, রজনী বোস লেনের কিছুটা ভেতরে সোহাগের দোকান। গত ৭ জুলাই চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে সোহাগ ও মহিনের মধ্যে বাগবিত-া ও হাতাহাতির মতো ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানতে পেরে সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিল পুলিশ। তখন সোহাগ জানান, মহিনের সঙ্গে ঝামেলা মিটে গেছে। কিন্তু মহিন চুপচাপ বসে থাকেনি। ওইদিনই হত্যার পরিকল্পনা করে টিটনের সঙ্গে। রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে মহিন তদন্তসংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন, সোহাগ খুবই একরোখা স্বভাবের ছিল। এজন্য তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়। শুরুতে তাকে দোকানেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এজন্য অস্ত্রও সংগ্রহ করা হয় ছোট মনিরের মাধ্যমে। কিন্তু তারা সম্প্রতি সময়ে মবের ঘটনাগুলো দেখে উৎসাহিত হয়। তাদের ধারণা ছিল সোহাগকে যদি মিটফোর্ডের ৩ নম্বর গেটের সামনে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে অনেকে মিলে উল্লাস করা যায় তাহলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিবে। আর এতে অত্র এলাকার ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী, অন্যান্য ব্যবসায়ী, অ্যাম্বুলেন্স চালক, রেস্টুরেন্ট, ফার্মেসি ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে অটোমেটিক্যালি কড়া বার্তা চলে যাবে মহিন গ্রুপের কথা না শুনলে পরিণতি হবে এর চেয়ে ভয়াবহ। এই চিন্তা থেকেই গত বুধবার সোহাগ দোকানে আসার পরেই ৭টি বাইকে করে ১৯ জন মিলে রজনী বোস লেনে প্রবেশ করে। এরপর সোহাগকে মারধর করতে করতে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে ইট-বালু-সিমেন্টের তৈরি পাথরসদৃশ কংক্রিট দিয়ে বার বার আঘাতে হত্যা করা হয়। এরপর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে মরদেহ টেনেহিঁচড়ে গেটের বাইরে এনে উল্লাস করা হয়।
এদিকে খুনিদের মধ্যে পুরনো ক্ষোভ ছিল দুজনের। এদের মধ্যে একজনের কপালে একটি কাটা দাগ রয়েছে। ওই দুই খুনি পুলিশকে জানিয়েছে, সোহাগ রগচটা ও একরোখা মানুষ ছিল। মতের অমিল হলেই গায়ে হাত দিয়ে বসত। কয়েকবছর আগে সোহাগ তাদের মারধর করে। কপালের কাটা দাগটি সোহাগের মারের কারণেই। পুরনো পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভ থেকেই তারা সোহাগকে মারধর করে। তারা ভেবেছিল উপস্থিত খুনিদের মধ্যে যুবদলের ও বর্তমানে প্রভাবশালী আরেকটি রাজনৈতিক দলের লোকজন থাকায় হত্যাকান্ড অন্যভাবে ধামাচাপা পড়ে যাবে।
অন্যদিকে, গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে তদন্তসংশ্লিষ্টরা এমন তথ্যও পেয়েছে মহিন, টিটন ও রবিন গ্যাঞ্জাম লাগছে বলে তাদের গ্রুপের সদস্যদের ঘটনার আগে ডেকে এনেছিল। অর্থাৎ হত্যায় অংশ নেওয়া ১৯ জনের অনেকেই জানতেন না সোহাগকে হত্যা করা হবে। তবে, ভাঙাড়ি দোকান থেকে সোহাগকে মিটফোর্ডে ধরে আনার পর মহিন সবাইকে বলতে থাকে- ‘ও (সোহাগ) বেঁচে থাকলে আমরা সবাই শেষ’। এরপরই সবাই সোহাগকে মেরে ফেলতে হামলা চালাতে থাকে।
আলোচিত এ ঘটনার তদন্তে অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ঘটনায় জড়িত সবাইকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। অস্ত্র মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই মনির হোসেন জীবন বলেন, অস্ত্রসহ রবিনকে গ্রেপ্তারের পর সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রবিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বলাটা উচিত হবে না। যদিও অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সোহাগকে হত্যা করতে রবিন অস্ত্রটি ছোট মনিরের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিল। অস্ত্র দেওয়ার সময় ছোট মনির বলেছিল কাজ শেষ হলে সেটি ফেরত দিয়ে আসতে।
সূত্র জানিয়েছে, রবিন হত্যা মামলারও আসামি হওয়ায় তাকে শ্যেন অ্যারেস্ট দেখানো হবে। মহিন রবিন ও টিটনকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলেও জানা গেছে।
মিটফোর্ড হাসপাতালে গতকাল রবিবার সরেজমিন দেখা গেছে, হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটে এখনো সেই কংক্রিটের টুকরা পড়ে আছে। গেটের চারপাশে সেই কংক্রিট দেখে শত মানুষ। কেউ কেউ আফসোস করে বলছেন, এটা দিয়েই ছেলেটাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক ইস্যু টেনে নানা কথা বলছেন। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে হঠাৎ করেই তিনটি গাড়িতে করে সেনাবাহিনী আসে ঘটনাস্থলে। জানতে চাইলে এক সৈনিক বলেন, অভিযানে এসেছেন।
রজনী বোস লেনের পুরোটাই ভাঙাড়ি দোকান। সব দোকান খোলা থাকলেও সোহাগের ‘সোহানা মেটাল’ নামে দোকানটি বন্ধ রয়েছে। যে স্টাইলে সোহাগকে ধরে এনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এতে অনেকটাই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাদের দাবি, এলাকাটিতে মহিনের মতো আরও ৫-৬টি গ্রুপ রয়েছে। মহিন গ্রেপ্তার হলেও অনুসারী ওই গ্রুপগুলো তাদের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভাঙাড়ি দোকানের মালিক বলেন, ৩ মাস আগে সোহাগ এই দোকানটি ভাড়া নিয়েছিল। আগে পাশেই অন্য গলিতে দোকান ছিল। বুধবার দোকানে আসার ৫ মিনিটের মধ্যে মহিন গ্রুপ মোটরসাইকেলে এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়।
নেত্রকোনা থেকে ২ ভাই গ্রেপ্তার : সোহাগ হত্যা মামলায় এজাহারনামীয় আরও দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উত্তরা বিভাগ। তারা হলো- সজীব ব্যাপারী (২৭) ও মো. রাজিব ব্যাপারী (২৫)। গত শনিবার রাত পৌনে ৪টার দিকে নেত্রকোনা জেলায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন।
২ আসামিকে আরও ৪ দিনের রিমান্ড : লাল চাঁদ ওরফে মো. সোহাগকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামি মো. আলমগীর ও মনির ওরফে লম্বা মনিরের ৪ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল রবিবার তাদের আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নাসির উদ্দিন সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের ৭দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ প্রত্যেকের ৪ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। এর আগে এ মামলায় গত বৃহস্পতিবার মাহমুদুল হাসান মহিনকে ৫ দিনের ও শনিবার টিটন গাজীর ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয় আদালত। এ ছাড়াও অস্ত্র আইনের মামলায় বৃহস্পতিবার তারেক রহমান রবিনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। রিমান্ড শেষে শনিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বিচারিক তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন : সোহাগ হত্যার ঘটনা তদন্তে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচারিক কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টের রিট আবেদন করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ এ রিট আবেদনটি করেন। এতে হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে আবেদনটি উপস্থাপন করেন রিটকারী আইনজীবী। কার্যতালিকায় আসার ওপর শুনানি হবে বলে জানান অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভুক্তভোগীর পরিবারকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা ও জনগণের জানমাল রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিতে আবেদনে আরজি জানানো হয়েছে।
আনসার সদস্যদের দায়িত্ব অবহেলা ছিল না: গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে লাল চাঁদ ওরফে মো. সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা দায় ছিল না। ঘটনার দিন আনসার সদস্যরা হাসপাতালের নির্ধারিত রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। রোস্টারের বাইরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গেটে আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ ছিল না।
তিনি আরও বলেন, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মোট নিয়োজিত আনসার সদস্যের সংখ্যা ৮০ জন। এরমধ্যে রোস্টার অনুযায়ী, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ২৪ স্পটে দায়িত্ব পালন করেন ২৫ জন আনসার সদস্য। হাসপাতালের কোথায় কিভাবে আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন সেটা নির্ধারণ করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তথা, ডিরেক্টর ও ডিডি (প্রশাসন)। সোহাগ হত্যার ঘটনা বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে। তখন ঘটনাস্থল ৩নং গেটে দায়িত্ব পালন অবস্থায় কোনো আনসার সদস্যকে রাখেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সুতরাং সোহাগ হত্যার ঘটনায় আনসার সদস্যদের অবহেলা বা ব্যত্যয় দেখার কোনো সুযোগ নেই।
