বিশ্বে প্রভাব বিস্তারে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৫, ০৭:৩৭ এএম

বাংলাদেশের ওপর বিদ্যমান শুল্কের অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। তবে এ শুল্ক কেবল বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। মূলত বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারকের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল আঁটা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ট্রাম্পের শুল্কের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পাল্টা শুল্কের বিষয়ে আলোচনা করছে। এসব আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু অন্যায্য দাবি উত্থাপন করছে, যা বিশ্বের কোনো দেশের পক্ষেই পরিপালন করা সম্ভব নয়। এটি বাণিজ্য ও শুল্ক সংক্রান্ত বিষয় হলেও আদতে যুক্তরাষ্ট্র একে বিভিন্ন দেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কেবল শুল্ক ও বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং দেশটি বিভিন্ন দেশকে মার্কিন সমরাস্ত্র ক্রয়ের শর্ত দিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ব্যাপারে যেমন সিদ্ধান্ত নেবে, তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার জন্য রপ্তানিকারক দেশটিকেও সেসব সিদ্ধান্ত অনুস্বাক্ষর করতে হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে সেই দেশের ওপর বাংলাদেশকেও নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো দেশের ওপর যদি সামরিক হস্তক্ষেপ করে তাহলে তাদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ দেশগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। বিষয়টি এমন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হলে তার শত্রুকে শত্রু ভাবতে হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাদের সঙ্গে সদ্ভাব রাখতে বলবে, তাদের সঙ্গে সদ্ভাব রাখতে হবে। আর এ ধরনের শর্তের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিশ^ব্যাপী মার্কিন সামরিক প্রভাবের বিস্তার ঘটানো। কেবল সামরিক বিষয় নয়, কূটনৈতিক বিষয়াদিও বাণিজ্যিক ইস্যুর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র। আর তাদের এসব অন্যায্য দাবির সঙ্গে যেসব দেশ একমত হবে না, তাদের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে। পাল্টা শুল্কের হার কমানোর শর্ত হিসেবে এসব বিষয় উত্থাপন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এর বাইরে অন্য যেসব পণ্য বাংলাদেশ চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে, সেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশ থেকে আমদানি করতে বলছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমানোর শর্ত হিসেবে তাদের দেশ থেকে এলএনজি আমদানির শর্ত দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ বর্তমানে যেসব উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করে, সেগুলো বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করলে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়তি খরচ লাগবে। এছাড়া তৈরি পোশাকের প্রধান কাঁচামাল তুলাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির শর্ত দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও বাড়তি খরচ পড়বে।

সরকারের উপদেষ্টারাও স্বীকার করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্কের আলোচনা কেবল শুল্ককেন্দ্রিক নয়। এখানে নানা অশুল্ক বিষয়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে গতকাল সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা বাণিজ্য আলোচনার চেয়েও ব্যাপক। শুধু শুল্ক নয়, সেখানে তারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্য দেশের সঙ্গে আপনি কীভাবে সম্পর্ক রাখছেন, সেটাও তারা দেখছে। এই নিয়ে একটি ফ্রেমওয়ার্ক করা হচ্ছে। সেটাও আলোচনার মধ্যে রয়েছে। শুধু শুল্ক নয়, অশুল্ক বাধা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’

গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। এ শুল্কের মূলমন্ত্র হচ্ছে যে দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি যত বেশি সেই দেশের ওপর পাল্টা শুল্কের হারও তত বেশি। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। বিশ্বের যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, সব দেশের ওপরই এমন শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। এমন শুল্ক আরোপের পর বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে ব্যাপক দরপতন দেখা দিয়েছিল। বিশ^ব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় শুরু হয়েছিল। পরে ৯ এপ্রিল সেই উদ্যোগ ৯০ দিনের জন্য পিছিয়ে দিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দরকষাকষির উদ্যোগ নিয়েছিল তারা। এরই মধ্যে ৯০ দিন শেষ হয় গত ৯ জুলাই। এ সময়ের মধ্যে দরকষাকষির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসার শর্ত ছিল। সেই মোতাবেক মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) সঙ্গে কয়েক দফা সভা হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু সে সব সভায় কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। এই আলোচনা চলমান থাকাকালেই গত ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর ফের ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ গত ৯ থেকে ১১ জুলাই তিনদিনের আলোচনা হয় ইউএসটিআর ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে। ওয়াশিংটনে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এ আলোচনায়ও পাল্টা শুল্ক কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মাত্রাতিরিক্ত শর্তের কারণে কোনো দেশের সঙ্গেই মার্কিন পাল্টা শুল্কের বিষয়ে সুরাহা হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাল্টা শুল্কের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে আলোচনা চলছে, তা থেকে ভালো কিছু আশা করা যাচ্ছে না। কারণ এখানে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক বিষয়ের চেয়েও বাণিজ্য বহির্ভূত বিষয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। বিশেষ করে তারা বিশ্বব্যাপী সমরাস্ত্র বিক্রি বাড়াতে চায়। সে জন্য আলোচনায় এসব বিষয়ও আনা হচ্ছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত বিশ্বের সব দেশকেই ভাবিয়ে তুলছে। সব মিলে বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং সময় অপেক্ষা করছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত